বায়ুদূষণের দুষ্টচক্রে ঢাকা — মোবাইল কোর্টের জরিমানা, কিন্তু সমাধান অধরাই
শুধুমাত্র মোবাইল কোর্ট অভিযান নয়—এই সমস্যা সমাধানে দরকার দীর্ঘমেয়াদি নীতি, উন্নত পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, এবং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি। ধুলাবালি, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, কারখানার বর্জ্য এবং অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ—সব মিলিয়ে ঢাকার বাতাসে এখন বিষ মিশে গেছে।
বায়ুদূষণের দুষ্টচক্রে ঢাকা — মোবাইল কোর্টের জরিমানা, কিন্তু সমাধান অধরাই
রাজধানীতে বায়ু ও শব্দদূষণ ভয়াবহ পর্যায়ে — পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযানে জরিমানা, কিন্তু সমাধান এখনো দূরের স্বপ্ন
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা বর্তমানে এমন এক বায়ু ও শব্দদূষণের দুষ্টচক্রে আটকা পড়েছে, যা কল্পনাকেও হার মানায়। শহরের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনের মালামাল রাস্তায় ফেলে রাখা, রাস্তার দুই পাশে বালু ও মাটির স্তূপ, এবং ধুলাবালি বাতাসে উড়ে বাসাবাড়ির ভেতরে প্রবেশ করছে—ফলে প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নগরবাসী। বিশেষ করে শিশু ও বয়োবৃদ্ধরা প্রতিদিনই শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি ও চোখ জ্বালাপোড়াসহ নানা শারীরিক সমস্যায় পড়ছেন।
যদিও সরকার ও পরিবেশ অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে, তবে নগরবাসীর অভিযোগ—এই পদক্ষেপগুলো এখনো “রুটিন ওয়ার্ক”-এর বাইরে কোনো স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না।
সর্ববশেষ বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর ২০২৫) রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় বায়ু ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ও বিজ্ঞ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহছিনা আকতার বানু এর নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে নির্মাণ সামগ্রী উন্মুক্ত অবস্থায় রেখে বায়ুদূষণ ঘটানোর দায়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা ও সতর্কবার্তা প্রদান করা হয়।
এছাড়াও শ্যামলী ও মিরপুর রোড এলাকায় কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে ১২টি মামলায় মোট ২৬ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। বেশ কয়েকজন চালককে সতর্ক করা হয়।
একই দিনে রামপুরা ব্রিজ ও শ্যামলী এলাকায় শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০০৬ অনুসারে পরিচালিত অভিযানে ৮টি মামলায় ২০ হাজার টাকা জরিমানা এবং ১২টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করা হয়।
অন্যদিকে, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০২২ অনুযায়ী সাভার এলাকায় পরিচালিত অভিযানে ৫টি মামলায় মোট ২৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয় এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিককে সতর্কবার্তা প্রদান করা হয়।
সারা দেশে অভিযানের চিত্র
পরিবেশ অধিদপ্তরের মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট উইং ২ জানুয়ারি থেকে ১৬ অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত সারা দেশে মোট ৫৮৭টি মোবাইল কোর্ট অভিযান পরিচালনা করেছে।
এর মধ্যে:
-
১,৬১৩টি মামলা
-
মোট জরিমানা আদায়: ৬ কোটি ৯ লক্ষ ৯০ হাজার ৪০০ টাকা
-
১২টি প্রতিষ্ঠান থেকে তিন ট্রাক সীসা ও ব্যাটারি গলানোর যন্ত্রপাতি জব্দ
-
১১টি অবৈধ কারখানা সিলগালা
-
৪১টি কারখানার সেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র মোবাইল কোর্ট অভিযান নয়—এই সমস্যা সমাধানে দরকার দীর্ঘমেয়াদি নীতি, উন্নত পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, এবং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি।
ধুলাবালি, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, কারখানার বর্জ্য এবং অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ—সব মিলিয়ে ঢাকার বাতাসে এখন বিষ মিশে গেছে।
একজন নগরবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“প্রতিদিন সকালে জানালা খুললেই ধুলা-মাটিতে ঘর ভরে যায়। শিশুদের স্কুলে পাঠানোই কষ্টকর। এই পরিস্থিতিতে শুধু জরিমানায় কিছু হবে না, সরকারকে কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে দূষণবিরোধী আইন।”
পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিশ্রুতি
পরিবেশ অধিদপ্তরের মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট উইং জানিয়েছে, এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও নিয়মিতভাবে চলবে এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে বাস্তবতা বলছে—নগরবাসীর নিঃশ্বাস এখনো স্বস্তির নয়।