বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ভিডিও, পুরোনো মামলায় গাজীপুরের কলেজছাত্র সিফাতকে কারাগারে পাঠাল আদালত
বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ফেসবুকে ভিডিও, পুরোনো সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় কলেজছাত্র সিফাতকে আটক, পরে আদালতের নির্দেশে গাজীপুরে কারাগারে পাঠানো হলো।
বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ভিডিও, পুরোনো মামলায় গাজীপুরের কলেজছাত্র সিফাতকে কারাগারে পাঠাল আদালত
গাজীপুরে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করা কলেজছাত্র সিফাত আব্দুল্লাহকে পুলিশ আটক করার পর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘বিদ্যুৎ বিলের বিরুদ্ধে কথা বলায় ছাত্রকে গ্রেপ্তার’ এই দাবিটি পুরোপুরি সঠিক নয় বলে একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন যাচাই করে দেখা গেছে।
সিফাত আব্দুল্লাহ রাজধানীর আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী। গাজীপুর মহানগরের গাছা এলাকার বাসিন্দা সিফাতকে ৩ সেপ্টেম্বর রাতে পুলিশ আটক করে। পরদিন ৪ সেপ্টেম্বর তাকে গাজীপুরের আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
ঘটনার সূত্রপাত একটি ফেসবুক ভিডিওকে কেন্দ্র করে। দ্য ডেইলি স্টার ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিফাত প্রায় এক মিনিট ২৪ থেকে ২৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে নিজের বাসার বিদ্যুৎ বিল দেখান। সেখানে তিনি দাবি করেন, এক মাসে প্রায় ৪ হাজার টাকা এবং আগের মাসে প্রায় ৫ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল এসেছে। তিনি বিলের পরিমাণকে অস্বাভাবিক বলে অভিযোগ করেন এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
তবে পুলিশ ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আরও একটি বিষয় উঠে এসেছে। পুলিশের দাবি, ওই ভিডিওতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্দেশে আপত্তিকর ও কটূক্তিপূর্ণ বক্তব্য ছিল। পুলিশ আরও দাবি করেছে, সিফাত এর আগেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আপত্তিকর বক্তব্য ও পোস্ট করেছিলেন।
গ্রেপ্তারের আইনি ভিত্তি নিয়েই ভাইরাল দাবিটির সঙ্গে প্রকাশিত তথ্যের সবচেয়ে বড় পার্থক্য রয়েছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিফাতের ওই ফেসবুক ভিডিওকে কেন্দ্র করে আলাদা কোনো মামলা করা হয়নি। বরং তাকে একটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই মামলায় নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি সংগঠনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল।
নিউ এজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিফাতকে একটি পুরোনো সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই মামলাটি ২৭ জুন দায়ের করা হয়েছিল এবং সিফাত তখন মামলার আসামি ছিলেন না। পরে তাকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, সিফাতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মকাণ্ড এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার যোগাযোগের অভিযোগও তদন্তের আওতায় এসেছে। তবে এসব অভিযোগ পুলিশের বক্তব্য ও মামলার অভিযোগের অংশ; আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে এগুলো উপস্থাপন করা উচিত নয়।
৪ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের আদালত সিফাতকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় আদালতে হাজির করা হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে তার আটকের ঘটনায় জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা আলী নাছের খান আপত্তি জানান এবং তার মুক্তির দাবি করেন।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিফাতের গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এনসিপির নেতা-কর্মীরা গাছা থানার সামনে অবস্থান নিয়ে তার মুক্তির দাবি করেন। তাদের বক্তব্য ছিল, সিফাত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করতেন এবং বিদ্যুৎ, তেল ও গ্যাসসহ বিভিন্ন বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত প্রকাশ করতেন।
সিফাতের ভিডিওতে যে ৪ হাজার ও ৫ হাজার টাকার বিদ্যুৎ বিলের কথা বলা হয়েছে, তার হাতে বিলের কাগজও দেখা গেছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তবে তার নির্দিষ্ট বিলের হিসাব ভুল ছিল কি না, মিটার রিডিং সঠিক ছিল কি না কিংবা বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের কোনো বিলিং ত্রুটি হয়েছিল কি না—এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি। ফলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের দাবিটি তার বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করাই যুক্তিযুক্ত।
ঘটনাটি নিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইন প্রয়োগের বিষয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। একদিকে সিফাতের সমর্থকেরা বলছেন, বিদ্যুৎ বিলসহ জনস্বার্থের বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলার কারণে তাকে হয়রানি করা হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশের দাবি, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কারণ শুধু বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অভিযোগ নয়; বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর বক্তব্য এবং তার বিরুদ্ধে থাকা মামলার অভিযোগও এর সঙ্গে যুক্ত।