ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার অভ্যন্তরে বাড়ছে আতঙ্ক, ব্যাহত হচ্ছে বিমান চলাচল জ্বালানি সরবরাহ

ইউক্রেনের ড্রোন হামলা রাশিয়ার ভেতরে বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনায় চাপ বাড়িয়েছে, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও তৈরি হয়েছে নতুন অস্থিরতা।

ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার অভ্যন্তরে বাড়ছে আতঙ্ক, ব্যাহত হচ্ছে বিমান চলাচল জ্বালানি সরবরাহ

ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার অভ্যন্তরে বাড়ছে আতঙ্ক, ব্যাহত হচ্ছে বিমান চলাচল জ্বালানি সরবরাহ


ইউক্রেন যুদ্ধের নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে ড্রোন হামলার বিস্তার। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন, জুলাই ও আগস্ট—এই তিন মাসে রাশিয়া ও অধিকৃত ক্রিমিয়া এলাকায় ৪৩ হাজার ৩০০টির বেশি ইউক্রেনীয় ড্রোন প্রতিহত করার দাবি করেছে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৭ হাজার ৭০০।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকতাগত সতর্কতা রয়েছে। এই সংখ্যাটি রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। যুদ্ধ চলাকালে কোনো পক্ষের সামরিক পরিসংখ্যানই সবসময় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয় না। তাই “৪৩ হাজার ৩০০ ড্রোন রাশিয়ায় প্রবেশ করেছে” বলা ভুল হবে। সঠিক বক্তব্য হলো—রাশিয়া দাবি করেছে, ওই সময় এত সংখ্যক ইউক্রেনীয় ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। 

এরপরও হামলার বাস্তব প্রভাব স্পষ্ট। বিভিন্ন রুশ অঞ্চলে বিমান চলাচল সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিমানবন্দর বন্ধ বা ফ্লাইট বাতিলের ঘটনা ঘটেছে। সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তির পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ ও শিল্প অবকাঠামো নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ কারণে যুদ্ধের প্রভাব রাশিয়ার সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনেও আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। 

ইউক্রেনের ড্রোন হামলার অন্যতম লক্ষ্য হয়ে উঠেছে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো। তেল শোধনাগার, সংরক্ষণাগার ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলার মাধ্যমে রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করার চেষ্টা করছে ইউক্রেন। যুদ্ধের সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সক্ষমতাকেও দুর্বল করার কৌশল হিসেবে এসব হামলাকে দেখা হচ্ছে।

রাশিয়ার জন্য সমস্যা শুধু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া নয়। কোনো এলাকায় ড্রোনের আশঙ্কা দেখা দিলে বিমান চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। এতে হাজার হাজার যাত্রী আটকে যেতে পারেন এবং বিমান সংস্থাগুলোর ওপর অতিরিক্ত খরচ তৈরি হয়। দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের পরিস্থিতি ব্যবসা ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

এদিকে রাশিয়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতদিন ইউক্রেনের যুদ্ধ মূলত রাশিয়ার বাইরে পরিচালিত সামরিক অভিযান হিসেবে অনেক মানুষের কাছে দৃশ্যমান ছিল। কিন্তু এখন ড্রোন হামলা রাশিয়ার শহর, বিমানবন্দর ও শিল্পাঞ্চলের কাছাকাছি পৌঁছানোয় যুদ্ধের বাস্তবতা দেশের অভ্যন্তরেও আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। 

মস্কো অবশ্য ড্রোন হামলা মোকাবিলায় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। রুশ কর্তৃপক্ষ প্রায়ই বিপুল সংখ্যক ড্রোন প্রতিহত করার দাবি করে। কিন্তু প্রতিহত করার পাশাপাশি কিছু ড্রোন যে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে সক্ষম হচ্ছে, তারও বিভিন্ন প্রমাণ ও প্রতিবেদন রয়েছে। ফলে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত থাকা সম্ভব হচ্ছে না।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেন রাশিয়ার ভূখণ্ডে সামরিক চাপ বাড়িয়ে রুশ যুদ্ধক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে চায়। রাশিয়ার সামরিক অবকাঠামো ও জ্বালানি ব্যবস্থায় আঘাত করার মাধ্যমে যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা কমানোর কৌশল এতে কাজ করছে।

অন্যদিকে রাশিয়া পাল্টা ইউক্রেনের শহর ও অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে দুই পক্ষের দূরপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাত্রা বাড়ছে। কিয়েভেও সাম্প্রতিক সময়ে রুশ হামলায় আবাসিক ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। 

এই পরিস্থিতি যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে। একদিকে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছে; অন্যদিকে মাঠের বাস্তবতায় সামরিক হামলা কমছে না। অর্থাৎ কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনা এবং যুদ্ধের তীব্রতা—দুইটি বিষয় একই সময়ে এগোচ্ছে।

সাধারণ মানুষের জন্য এর অর্থ হলো অনিশ্চয়তা আরও দীর্ঘায়িত হওয়া। বিমানবন্দর বন্ধ, ফ্লাইট বাতিল, জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা এবং নিরাপত্তা সতর্কতার মতো বিষয় যুদ্ধকে সরাসরি নাগরিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত করছে। বিশেষ করে রাশিয়ার বড় শহরগুলোর বাইরে থাকা শিল্পাঞ্চল ও জ্বালানি অবকাঠামোও এখন যুদ্ধের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর