৩৫ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য ব্যয়ে যুদ্ধবিমান: ভঙ্গুর অর্থনীতিতে দায় মেটাবে কীভাবে বাংলাদেশ?

বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের উদ্যোগ নতুন করে বড় আর্থিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—বহু হাজার কোটি টাকার যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাব্য দায় বর্তমান অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে সরকার কীভাবে বহন করবে?

৩৫ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য ব্যয়ে যুদ্ধবিমান: ভঙ্গুর অর্থনীতিতে দায় মেটাবে কীভাবে বাংলাদেশ?

৩৫ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য ব্যয়ে যুদ্ধবিমান: ভঙ্গুর অর্থনীতিতে দায় মেটাবে কীভাবে বাংলাদেশ?


বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের উদ্যোগ নতুন করে বড় আর্থিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—বহু হাজার কোটি টাকার যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাব্য দায় বর্তমান অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে সরকার কীভাবে বহন করবে?

চীন থেকে J-10CE যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিক আলোচনার দিকে এগোচ্ছে বলে ২৫ আগস্ট Reuters জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি সরকারি প্যানেল চীনের সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রাথমিক চুক্তির খসড়া প্রস্তুত করছে। তবে যুদ্ধবিমানের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা, মোট মূল্য এবং সরবরাহের সময় তখনও নির্ধারিত হয়নি।

এর আগে সরকারি নথির ভিত্তিতে The Business Standard জানিয়েছিল, ২০টি J-10CE কেনার সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলার বা ২৭,০৬০ কোটি টাকা হতে পারে। ফলে বিভিন্ন সংবাদ ও আলোচনায় যে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার অঙ্কটি উঠে আসছে, সেটিকে বর্তমানে চূড়ান্ত চুক্তিমূল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ, অস্ত্রভাণ্ডার ও অন্যান্য সহায়ক প্যাকেজ যুক্ত হলে মোট ব্যয় বাড়তে পারে—এটি একটি সম্ভাব্য আর্থিক কাঠামো, নিশ্চিত চুক্তিমূল্য নয়।

বাজেট ঘাটতির সঙ্গে যুদ্ধবিমানের ব্যয়ের তুলনা

বাংলাদেশের ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, আর বাজেট ঘাটতি নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা GDP-এর প্রায় ৩.৬ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে সরকার দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করবে।

অর্থাৎ ৩৫ হাজার কোটি টাকার একটি সম্ভাব্য যুদ্ধবিমান প্যাকেজকে যদি হিসাবের ভিত্তি ধরা হয়, সেটি এক বছরের বাজেট ঘাটতির প্রায় ১৪ শতাংশের সমান। আর ২৭,০৬০ কোটি টাকার সম্ভাব্য J-10CE ক্রয়মূল্যও বাজেট ঘাটতির প্রায় ১১ শতাংশ।

তবে পুরো ক্রয়মূল্য এক বছরে পরিশোধ করতে হবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সাধারণত এককালীন নগদ ব্যয়ের পরিবর্তে কিস্তি, ঋণ, supplier credit বা নির্দিষ্ট অর্থায়ন কাঠামোর মাধ্যমে কেনা হতে পারে। তাই আসল প্রশ্ন শুধু ‘কত টাকা লাগবে’ নয়; কত বছরে, কোন সুদে এবং কোন বৈদেশিক মুদ্রায় সেই দায় পরিশোধ করতে হবে—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারের আর্থিক সক্ষমতা কতটা?

বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে রাজস্ব সংগ্রহের দুর্বলতা। IMF-এর ২০২৫ Article IV মূল্যায়নে বলা হয়েছে, FY2024-এ বাংলাদেশের tax revenue ছিল GDP-এর ৭.৪ শতাংশ, যা FY2025-এ কমে ৬.৯ শতাংশে নেমেছে। IMF একই সঙ্গে দুর্বল রাজস্ব এবং আর্থিক খাতের ঝুঁকিকে বাংলাদেশের প্রধান সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

অন্যদিকে সরকারের ঋণের সুদ পরিশোধের চাপও দ্রুত বাড়ছে। ২০২৬–২৭ বাজেটে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় ঋণের সুদ বাবদ প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক ঋণের জন্য ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এই সুদ ব্যয়ই বাজেটের প্রায় ১৩.৬ শতাংশ এবং NBR-এর লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক রাজস্বের প্রায় ২১ শতাংশের সমান।

এ অবস্থায় নতুন বড় প্রতিরক্ষা ঋণ নিলে তার মূল অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু ক্রয়মূল্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ঋণের সুদ, বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং যুদ্ধবিমান পরিচালনার দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ও রাষ্ট্রের ওপর যুক্ত হবে।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি: বৈদেশিক মুদ্রার দায়

যুদ্ধবিমান কেনার অর্থ সাধারণত ডলার বা অন্য বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয়। ফলে টাকার অবমূল্যায়ন হলে একই ডলারের ঋণ পরিশোধে সরকারের বেশি টাকা প্রয়োজন হবে।

উদাহরণ হিসেবে, ৩৫ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য ব্যয়কে যদি সম্পূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রাভিত্তিক দায় হিসেবে ধরা হয় এবং ভবিষ্যতে টাকা ডলারের বিপরীতে ১০ শতাংশ দুর্বল হয়, তাহলে টাকায় হিসাব করা দায় আনুপাতিকভাবে প্রায় ৩৮,৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে—সুদ ও অন্যান্য ব্যয় বাদ দিয়েই।

এটি কোনো পূর্বাভাস নয়; এটি বিনিময় হারজনিত ঝুঁকির একটি সরল হিসাব। প্রকৃত দায় নির্ভর করবে চুক্তির মুদ্রা, বিনিময় হার, কিস্তির সময়সূচি ও অর্থায়নের ধরন থেকে।

ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে আরেক ধরনের চাপ

বাংলাদেশের সরকার ইতোমধ্যে বাজেট ঘাটতি মেটাতে দেশীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। FY2026–27 বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজস্ব আহরণে সীমাবদ্ধতার কারণে বাজেটের অর্থায়ন মেটাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ বাড়ছে; Q3 FY2026-এ public-sector credit growth বছরে ৩১.৫১ শতাংশে পৌঁছেছিল।

এখানেই যুদ্ধবিমান ক্রয়ের অর্থায়ন নিয়ে নীতিগত প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। যদি প্রতিরক্ষা ক্রয়ের অর্থায়নও ব্যাপকভাবে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভর করে, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য ব্যাংক ঋণের জায়গা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণ নিলে বাড়বে বৈদেশিক মুদ্রার দায়।

অর্থাৎ—

দেশীয় ঋণ → সুদ ও crowding-out ঝুঁকি।

বৈদেশিক ঋণ → ডলার ও exchange-rate ঝুঁকি।

তাহলে যুদ্ধবিমান কেনার যৌক্তিকতা নেই?

এখানে অর্থনৈতিক যুক্তির পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তিও বিবেচনা করতে হবে।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর পুরোনো যুদ্ধবিমান বহর ধীরে ধীরে আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তার মুখে রয়েছে। একটি রাষ্ট্রের আকাশসীমা সুরক্ষা, deterrence capability এবং আধুনিক সামরিক প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার জন্য নতুন combat aircraft প্রয়োজন হতে পারে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—কতগুলো বিমান, কী ধরনের বিমান এবং কোন অর্থায়ন কাঠামোয় কেনা হবে?

একটি দরিদ্র বা সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার রাষ্ট্রের জন্য শুধু বিমান কেনার খরচ নয়, পরবর্তী ২০–৩০ বছরের lifecycle cost বিবেচনা করা জরুরি। যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রে pilot training, simulator, অস্ত্র, radar integration, spare parts, maintenance, engine overhaul, infrastructure এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার ব্যয় ক্রয়মূল্যের বাইরে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় তৈরি করে।

সুতরাং ২৭ হাজার বা ৩৫ হাজার কোটি টাকার headline price প্রকৃত আর্থিক দায়ের সম্পূর্ণ চিত্র নাও হতে পারে।

প্রতিরক্ষা বাজেটও সীমাহীন নয়

২০২৬–২৭ অর্থবছরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রায় ৪২,৪৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে বলে বাজেট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ৩৫ হাজার কোটি টাকার কোনো fighter acquisition package প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বছরের মোট বরাদ্দের প্রায় ৮২ শতাংশের কাছাকাছি। তবে এটিও সরাসরি তুলনা মাত্র—প্রতিরক্ষা বাজেটের পুরোটা যুদ্ধবিমান কেনার জন্য ব্যয় করা যায় না এবং বড় সামরিক ক্রয় বহু বছরের অর্থায়ন কাঠামোয় হতে পারে।

তবু এই তুলনা একটি বিষয় স্পষ্ট করে: যুদ্ধবিমান কেনা একটি সাধারণ বার্ষিক প্রতিরক্ষা ব্যয় নয়; এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনার অংশ হওয়া উচিত।

দায় শোধ করবে কীভাবে সরকার?

অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাব্য কয়েকটি পথ রয়েছে-

প্রথমত, দীর্ঘমেয়াদি এবং স্বল্পসুদের রাষ্ট্রীয় বা supplier financing। এতে একবারে বড় বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমতে পারে।

দ্বিতীয়ত, দীর্ঘ মেয়াদের কিস্তি ব্যবস্থা। এতে বার্ষিক বাজেটের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কমবে, যদিও মোট সুদ ব্যয় বাড়তে পারে।

তৃতীয়ত, বিদেশি অনুদান বা soft financing-এর সঙ্গে সামরিক ক্রয়কে যুক্ত করা—যদিও উন্নত যুদ্ধবিমান কেনার ক্ষেত্রে এ ধরনের অর্থায়ন পাওয়া সাধারণত কঠিন।

চতুর্থত, বাজেটের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস। কিন্তু এর অর্থ হবে অন্য কোনো খাতে সরকারি ব্যয় কমানো বা নতুন রাজস্ব আহরণ করা।

পঞ্চমত, রাজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি। IMF-ও বাংলাদেশকে tax revenue mobilization বাড়ানো এবং subsidy rationalisation-এর মাধ্যমে fiscal space তৈরির পরামর্শ দিয়েছে।

মূল প্রশ্নটি যুদ্ধবিমান নয়, অর্থায়নের স্বচ্ছতা

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত—চুক্তির মোট মূল্য কত, অর্থায়নের উৎস কী, সুদের হার কত, repayment period কত বছর, currency risk কে বহন করবে এবং maintenance ও weapons package-এর দীর্ঘমেয়াদি খরচ কত।

চূড়ান্ত চুক্তি প্রকাশের আগে শুধু ‘৩৫ হাজার কোটি টাকার যুদ্ধবিমান’ বলা যেমন অতিরঞ্জিত হতে পারে, তেমনি শুধু ক্রয়মূল্য দেখিয়ে প্রকৃত আর্থিক দায়কে ছোট করে দেখাও ভুল হবে।

IMF বলছে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো দুর্বল রাজস্ব, আর্থিক খাতের ঝুঁকি এবং মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে রয়েছে; জুলাই ২০২৬-এর IMF মিশন আরও বলেছে, রাজস্ব বৃদ্ধি, ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কার জরুরি।

তাই বাংলাদেশের জন্য যুদ্ধবিমান কেনার প্রশ্নটি ‘নিরাপত্তা বনাম অর্থনীতি’—এমন সরল দ্বন্দ্ব নয়। বরং প্রশ্ন হলো: জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে এমন কোনো ঋণ কাঠামো তৈরি হচ্ছে কি না, যার সুদ ও বৈদেশিক মুদ্রার দায় ভবিষ্যৎ সরকার ও করদাতাদের ওপর অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি করবে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি ভঙ্গুর রাজস্ব কাঠামোর দেশে বড় সামরিক ক্রয়ের সঠিক মাপকাঠি হওয়া উচিত শুধু ‘বিমানটি কত আধুনিক’ নয়—বরং ‘রাষ্ট্রটি আগামী ২০ বছর এর পুরো lifecycle cost বহন করতে পারবে কি না।’

বিশ্লেষণ : এস গোস্বামী,  সি এস বি নিউজ, ইউ এস এ

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর