পাকিস্তানে ৪০ শতাংশ শিশু খর্বকায়, অপুষ্টিতে বছরে ১৭ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি

পাকিস্তানে পাঁচ বছরের কম বয়সী ৪০ শতাংশ শিশু খর্বকায়। অপুষ্টির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, বছরে অর্থনীতিতে ক্ষতি হচ্ছে ১৭ বিলিয়ন ডলার।

পাকিস্তানে ৪০ শতাংশ শিশু খর্বকায়, অপুষ্টিতে বছরে ১৭ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি

পাকিস্তানে ৪০ শতাংশ শিশু খর্বকায়, অপুষ্টিতে বছরে ১৭ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি


পুষ্টির ঘাটতিতে শৈশবেই পিছিয়ে পড়ছে লাখ লাখ শিশু। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মক্ষমতা এবং দেশের অর্থনীতিতে।

পাকিস্তান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য দেশটির বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করছে। তবে দেশটির পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু খর্বকায় হয়ে বেড়ে উঠছে।

দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির কারণে এসব শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে তাদের শিক্ষা, কর্মদক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার ওপরও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জাতীয় পুষ্টি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৪০ দশমিক ২ শতাংশ খর্বকায়। এছাড়া ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু উচ্চতার তুলনায় কম ওজনের সমস্যায় এবং ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ শিশু বয়সের তুলনায় কম ওজনের সমস্যায় ভুগছে।

খর্বকায় হওয়া সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। শৈশবে দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধির পাশাপাশি মস্তিষ্কের বিকাশ ও শেখার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপুষ্টির প্রভাব শুধু শিশুর শৈশবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরবর্তী জীবনে শিক্ষা, কর্মদক্ষতা, আয় এবং উৎপাদনশীলতার ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

পাকিস্তানের জন্য শিশুদের অপুষ্টি তাই শুধু একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটও তৈরি করছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, অপুষ্টির কারণে দেশটিকে প্রতি বছর প্রায় ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।

এই অর্থনৈতিক ক্ষতির পেছনে রয়েছে অপুষ্টিজনিত অসুস্থতার চিকিৎসা ব্যয়, শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া এবং ভবিষ্যতে কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার মতো বিভিন্ন বিষয়।

শিশুদের খর্বকায় হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। গর্ভাবস্থায় মায়ের অপুষ্টি, পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা, শিশুকে সঠিকভাবে খাওয়ানোর অভাব এবং বারবার সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়া এর অন্যতম কারণ।

এ ছাড়া নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যকর স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশের অভাবও শিশুদের অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। দরিদ্র পরিবারগুলোতে পুষ্টিকর খাবারের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

পাকিস্তানের গ্রামীণ এলাকাগুলোতে শিশুদের অপুষ্টির পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি উদ্বেগজনক। জাতীয় পুষ্টি জরিপে শহরের তুলনায় গ্রামীণ এলাকায় খর্বকায় শিশুর হার বেশি পাওয়া গেছে।

দেশটির বিভিন্ন প্রদেশেও এই সংকটের মাত্রায় পার্থক্য রয়েছে। বেলুচিস্তান, সিন্ধু ও খাইবার পাখতুনখোয়ার বিভিন্ন এলাকায় শিশুদের খর্বকায় হওয়ার হার জাতীয় গড়ের চেয়েও বেশি।

এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও পাকিস্তানের খাদ্য ও পুষ্টি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে। বন্যা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং কৃষি ও জীবিকার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দরিদ্র পরিবারগুলোর খাদ্যনিরাপত্তা দুর্বল করে দিতে পারে।

বন্যা বা বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ কমে যায়। এতে শিশু ও গর্ভবতী নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েন।

শিশুদের পুষ্টির সঙ্গে মায়ের স্বাস্থ্যও সরাসরি সম্পর্কিত। গর্ভাবস্থায় একজন মা পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে গর্ভের শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, পাকিস্তানে প্রতি ১ লাখ জীবিত শিশুর জন্মে ১৫৫ জন মায়ের মৃত্যু হচ্ছে। মাতৃস্বাস্থ্য ও গর্ভকালীন পুষ্টি নিশ্চিত করা তাই শিশুদের অপুষ্টি মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর জন্মের আগের সময় থেকে জীবনের প্রথম দুই বছর পর্যন্ত সময়টি পুষ্টির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে মায়ের পর্যাপ্ত পুষ্টি, নিরাপদ প্রসব, বুকের দুধ এবং সময়মতো পরিপূরক খাবার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

পাকিস্তান সরকার ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা শিশু ও মায়েদের অপুষ্টি কমাতে নানা কর্মসূচি পরিচালনা করছে। দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের গর্ভবতী নারী এবং শিশুদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

তবে শুধু অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা করলেই এই সংকটের সমাধান হবে না। পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মায়েদের পুষ্টি বাড়ানো, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নত করা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করাও জরুরি।

মা ও শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করতে পাকিস্তানে ‘অ্যাক্ট ফর নিউট্রিশন’ নামে একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে অপুষ্টি কমানো, পুষ্টি বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সমাধান নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে।

পাকিস্তান যদি তার তরুণ জনগোষ্ঠীকে ভবিষ্যতের শক্তিশালী কর্মশক্তিতে পরিণত করতে চায়, তাহলে শিশুদের অপুষ্টি মোকাবিলাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

কারণ আজকের অপুষ্ট শিশুরাই আগামী দিনের কর্মী ও নাগরিক। তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, বরং পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর