পাকিস্তানের রাজধানীতে হাসপাতালের আগুনে ১৪ নবজাতকের মৃত্যু

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে বুধবার একটি হাসপাতালের নবজাতক পরিচর্যা কেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ডে ১৪ নবজাতক মারা গেছে। এটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানের কোনো স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনাগুলোর একটি

পাকিস্তানের রাজধানীতে হাসপাতালের আগুনে ১৪ নবজাতকের মৃত্যু

পাকিস্তানের রাজধানীতে হাসপাতালের আগুনে ১৪ নবজাতকের মৃত্যু


পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে বুধবার একটি হাসপাতালের নবজাতক পরিচর্যা কেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ডে ১৪ নবজাতক মারা গেছে। এটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানের কোনো স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনাগুলোর একটি।

ঘটনাটি ঘটে ইসলামাবাদের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস (PIMS)-এ। স্থানীয় সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সকাল ৭টার কিছু আগে মাতৃসদনের একটি এয়ার-কন্ডিশনিং ইউনিট বিস্ফোরণের পর আগুন ছড়িয়ে পড়ে। উদ্ধারকারী দল ছয়টি ফায়ার ইঞ্জিন ও চারটি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ঘটনাস্থলে গেলেও আগুন অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় নবজাতক ওয়ার্ডের মাত্র একটি শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

নিহতদের মধ্যে বাহাদুর খান নামের এক সবজি বিক্রেতার তিন দিন বয়সী যমজ দুই কন্যাও ছিল। মঙ্গলবার রাতে তিনি স্ত্রী ও নবজাতক দুই মেয়েকে হাসপাতালে রেখে বিশ্রামের জন্য বাড়ি গিয়েছিলেন। বুধবার তার স্ত্রী নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং তখনও জানতেন না যে তার দুই সন্তান মারা গেছে।

হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে বাহাদুর খান বলেন, এই трагেডির জন্য দায়ী কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া উচিত।

স্বাস্থ্য সচিবকে বরখাস্ত

অগ্নিকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ দেশটির স্বাস্থ্য সচিব আসলাম গওরিকে বরখাস্ত করেন। তিনি ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দিয়ে বলেন, দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নিতে হবে।

অগ্নিকাণ্ডের পর পাকিস্তানের সরকারি হাসপাতালগুলোর নিরাপত্তা ও অবকাঠামোর দুরবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

দেশটির শীর্ষ চিকিৎসক সংগঠনের মহাসচিব আবদুল গফুর শোরো অভিযোগ করেন, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকির ঘাটতি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পরিণত করেছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানের স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় অন্যতম নিম্ন। জুনে নতুন জাতীয় বাজেট অনুমোদনের পর দেশটির সবচেয়ে বড় চিকিৎসক সংগঠনও সতর্ক করেছিল যে কাঠামোগত অবহেলার কারণে পাকিস্তানের স্বাস্থ্য অবকাঠামো “পদ্ধতিগত ধসের” অবস্থায় রয়েছে।

দরজা বন্ধ ছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক

আগুন থেকে বেঁচে যাওয়া এক নবজাতকের বাবা আলম জাইব সাংবাদিকদের জানান, তিনি আগুন লাগা ওয়ার্ডে ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু দরজা বন্ধ পেয়েছিলেন।

হাসপাতালের বাইরে থাকা কয়েকজন রোগীর স্বজনও অভিযোগ করেন, সন্তানদের কাছে অভিভাবকদের অতিরিক্ত যাতায়াত ঠেকাতে ওয়ার্ডের দরজা বন্ধ রাখা হতো। তাদের দাবি, ওয়ার্ডে মাত্র একটি প্রবেশপথ ছিল এবং কোনো কার্যকর জরুরি বহির্গমন পথ ছিল না।

তবে PIMS-এর নির্বাহী পরিচালক রানা ইমরান সিকান্দার দাবি করেন, ক্ষতিগ্রস্ত ওয়ার্ডগুলোর দরজা বন্ধ ছিল না। তিনি জানান, সরকার ইতোমধ্যে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তদন্তে বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা হবে ওয়ার্ডের দরজা তালাবদ্ধ ছিল কি না এবং থাকলে কেন ছিল।

ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা

ঘটনাটি পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনেও উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। হাসপাতালে সরকারি কর্মকর্তারা গেলে বিরোধী দলের সমর্থকেরা স্লোগান দেন—

“আর কোনো ফটো অপ নয়! আমাদের সন্তানদের হত্যা বন্ধ করুন!”

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, যিনি ২০২৩ সাল থেকে কারাগারে রয়েছেন, সম্প্রতি এই হাসপাতালেই চিকিৎসা পরীক্ষা করিয়েছিলেন। ফলে অগ্নিকাণ্ডের পর ইমরান খানের দলও সরকারের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও হাসপাতালের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ইমরান খানের দলের সাবেক আইনপ্রণেতা ফাহিম খান বলেন, একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য যে হাসপাতাল ব্যবহার করা হচ্ছে, সেখানে যদি সাধারণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাই নিশ্চিত না থাকে, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

পাকিস্তানে ধারাবাহিক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা

এই অগ্নিকাণ্ড এমন এক সময়ে ঘটল, যখন পাকিস্তানে শিশু ও জনসাধারণকে ঘিরে একের পর এক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটছে।

গত জুনে পাঞ্জাবের লাহোরের উপকণ্ঠে একটি কোচিং সেন্টারের ছাদ ধসে ১৪ শিশু নিহত হয়েছিল। এর আগে জানুয়ারিতে করাচির একটি শপিং মলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ২৩ জনের মৃত্যু হয়।

PIMS-এর মাতৃসদনে ১৫০টিরও বেশি শয্যা রয়েছে। রাজধানী ইসলামাবাদের দুই মিলিয়নেরও বেশি মানুষের জন্য এটি অন্যতম প্রধান সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান।

মূল প্রশ্ন এখন—মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে ১৪টি নবজাতকের প্রাণহানি কীভাবে ঘটল, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা কেন কার্যকর ছিল না এবং হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কার গাফিলতি ছিল। তদন্তের ফলাফলের ওপরই এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর