কেন ইরান ইসরায়েলের ওপর হামলার ঝুঁকি নিল

ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালানোর পর ইরানের পাল্টা আক্রমণ প্রথম দেখায় ঝুঁকিপূর্ণ মনে হতে পারে, কারণ এটি মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছে। তবে তেহরানের দৃষ্টিতে এই ঝুঁকি নেওয়া জরুরি ছিল। ইরান মনে করে, ইসরায়েল আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নিজেদের পক্ষে বদলানোর চেষ্টা করছে এবং তাদের মিত্রদের দুর্বল করছে

PostImage

কেন ইরান ইসরায়েলের ওপর হামলার ঝুঁকি নিল


ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালানোর পর ইরানের পাল্টা আক্রমণ প্রথম দেখায় ঝুঁকিপূর্ণ মনে হতে পারে, কারণ এটি মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছে। তবে তেহরানের দৃষ্টিতে এই ঝুঁকি নেওয়া জরুরি ছিল। ইরান মনে করে, ইসরায়েল আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নিজেদের পক্ষে বদলানোর চেষ্টা করছে এবং তাদের মিত্রদের দুর্বল করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের জন্য হামলার জবাব না দেওয়া দুর্বলতার বার্তা দিত। কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরান তাদের প্রধান মিত্র লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলি হামলার সমালোচনা করলেও সরাসরি প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। তবে তারা সতর্ক করেছিল, যদি হামলা বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে—যেখানে হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি—ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তাদের অবস্থান বদলে যাবে।

ইরানের প্রভাবশালী উপদেষ্টা পরিষদের প্রধান সাদেক লারিজানি বলেন, লেবাননের পক্ষে ইরানের এই হামলা শুধু সামরিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং একটি নতুন কৌশলগত নীতির ঘোষণা। তাঁর মতে, “প্রতিরোধ অক্ষের” (Axis of Resistance) কোনো অংশ আক্রান্ত হলে তার জবাব সীমান্তের বাইরে গিয়েও দেওয়া হবে এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দেওয়া হবে।

ইরান চায় দেখাতে যে তারা তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের রক্ষায় সত্যিই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কারণ ২০২৪ সালে হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতা হাসান নাসরাল্লাহ নিহত হওয়ার পর ইসরায়েলি হামলার জবাব না দেওয়ায় ইরানের পূর্ববর্তী নেতৃত্বের সমালোচনা হয়েছিল।

ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের পর ইরানের নতুন নেতৃত্ব আরও আক্রমণাত্মক নীতি গ্রহণ করে। তারা মনে করে, হরমুজ প্রণালীর ওপর প্রভাব বজায় রাখা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে চাপ সৃষ্টি করার মাধ্যমে তারা কৌশলগত সুবিধা অর্জন করেছে। কঠোরপন্থীরা এটিকে পূর্ববর্তী নেতৃত্বের সংযত নীতির ব্যর্থতার বিপরীতে সফল কৌশল হিসেবে দেখছেন।

তাদের যুক্তি হলো, অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়া কিংবা অন্যান্য হামলার পর সীমিত প্রতিক্রিয়া দেখানোর ফল ছিল আরও বেশি চাপ ও হামলা। বিপরীতে, শক্ত অবস্থান নেওয়ার ফলে এখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের হিসাব-নিকাশ বদলাতে হচ্ছে।

হিজবুল্লাহকে রক্ষা করা শুধু রাজনৈতিক অবস্থান নয়, সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। ইরানি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হামিদরেজা আজিজির মতে, ভবিষ্যতে কোনো সংঘাত হলে উত্তর ইসরায়েলের ওপর চাপ বজায় রাখতে হিজবুল্লাহর সক্ষমতা ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ইসরায়েল যদি হিজবুল্লাহকে আরও দুর্বল করতে পারে, তবে সেটি ইরানের জন্য কৌশলগত ক্ষতি হবে।

ইরান আরও মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির সময়কে কাজে লাগিয়ে তাদের সাম্প্রতিক কৌশলগত অর্জনগুলো ধীরে ধীরে ক্ষয় করার চেষ্টা করছে। হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি এবং হিজবুল্লাহর ওপর চাপ বাড়ানোকে তারা একই বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব যুদ্ধের সম্ভাবনাকে আগের তুলনায় কম ভয় পায়। তাদের বিশ্বাস, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট ও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের কারণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সহজে আরেকটি বড় যুদ্ধে জড়াতে চাইবেন না। আর যুদ্ধ হলেও তা মোকাবিলা করার সক্ষমতা তাদের রয়েছে বলে তারা মনে করে।

সংক্ষেপে, ইরানের দৃষ্টিতে এই হামলা ছিল শুধু প্রতিশোধ নয়; এটি তাদের আঞ্চলিক প্রভাব, মিত্রদের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ শক্তির ভারসাম্য রক্ষার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর