ইরানের ড্রোন ‘সোয়ার্ম’ হামলা: যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ‘গুণিতক ব্যয়’ চাপ, দীর্ঘায়িত হচ্ছে যুদ্ধ

ইরানের ড্রোন ‘সোয়ার্ম’ হামলা: যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ‘গুণিতক ব্যয়’ চাপ, দীর্ঘায়িত হচ্ছে যুদ্ধ

PostImage

ইরানের ড্রোন ‘সোয়ার্ম’ হামলা: যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ‘গুণিতক ব্যয়’ চাপ, দীর্ঘায়িত হচ্ছে যুদ্ধ


মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান ব্যাপকহারে স্বল্পমূল্যের আত্মঘাতী ড্রোন ব্যবহার করে যে ‘সোয়ার্ম’ (ঝাঁক) কৌশল প্রয়োগ করছে, তা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর “গুণিতক ব্যয়” (exponential costs) চাপিয়ে যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করছে—এমনটাই বলছেন সামরিক বিশ্লেষকরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এক ধরনের অসম যুদ্ধকৌশল (asymmetric capability), যেখানে কম খরচে বেশি চাপ সৃষ্টি করে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে ফেলা লক্ষ্য।

শাহীদ ড্রোন: কম দামে বেশি চাপ

ইরান যে ড্রোনগুলো ব্যবহার করছে, তার মধ্যে Shahed-136 অন্যতম। এগুলো একমুখী (one-way) বা আত্মঘাতী ড্রোন—লক্ষ্যে আঘাত হেনেই ধ্বংস হয়। তুলনামূলকভাবে কম দামে উৎপাদনযোগ্য এসব ড্রোন একসঙ্গে বহু সংখ্যায় ছোড়া হলে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও চাপে ফেলে।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, একটি শাহীদ ড্রোনের উৎপাদন ব্যয় যেখানে কয়েক দশ হাজার ডলারের মধ্যে, সেখানে সেগুলো ঠেকাতে ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের MIM-104 Patriot বা THAAD ব্যবস্থার প্রতিটি নিক্ষেপই ব্যয়বহুল—ফলে দীর্ঘমেয়াদে রসদ ও বাজেটে চাপ বাড়ছে।

সাম্প্রতিক হামলা ও ক্ষয়ক্ষতি

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি ও কূটনৈতিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা বেড়েছে। আঞ্চলিক সূত্রগুলো বলছে, কিছু ক্ষেত্রে ড্রোন প্রতিরক্ষা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে, আবার অনেকগুলো মাঝপথেই ভূপাতিত হয়েছে।

হামলার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সদস্য হতাহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উল্লেখ রয়েছে। নিরাপত্তা সূত্রের দাবি, আকাশ প্রতিরক্ষা সক্রিয় রাখতে বিপুলসংখ্যক ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা মজুত দ্রুত কমিয়ে দিচ্ছে।

‘অ্যাট্রিশন’ কৌশল: ক্লান্ত করে জয়

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের লক্ষ্য সরাসরি সামরিক জয় নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদে প্রতিপক্ষকে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে ক্লান্ত করে ফেলা। এই ‘অ্যাট্রিশন’ বা ক্ষয়যুদ্ধ কৌশলে কম খরচের আক্রমণাত্মক প্ল্যাটফর্ম দিয়ে বেশি খরচের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বারবার সক্রিয় করতে বাধ্য করা হয়।

ইরান বহু বছর ধরে ড্রোন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করেছে এবং আন্ডারগ্রাউন্ড স্টোরেজ ও উৎপাদন সুবিধার ভিডিও প্রকাশ করে সক্ষমতার ইঙ্গিত দিয়েছে। সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বড় আকারের ‘সোয়ার্ম’ হামলা সমন্বয় করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নেটওয়ার্কভিত্তিক নির্দেশনা ব্যবস্থাও ব্যবহার করা হতে পারে।

আঞ্চলিক প্রভাব ও জ্বালানি নিরাপত্তা

ড্রোন হামলার বিস্তার পারস্য উপসাগরীয় বাণিজ্যপথ ও জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ একাধিক দেশ তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদার করেছে। তেল স্থাপনা বা বন্দর এলাকায় বড় ধরনের ক্ষতি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।

ইরানের ড্রোন ‘সোয়ার্ম’ কৌশল আধুনিক যুদ্ধের এক নতুন বাস্তবতা তুলে ধরছে—যেখানে স্বল্পমূল্যের, ব্যাপক উৎপাদনযোগ্য ইউএভি উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও চাপে ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এখন শুধু সামরিক চ্যালেঞ্জ নয়, বরং অর্থনৈতিক ও রসদসংকটের ঝুঁকিও মোকাবিলা করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অসম লড়াই দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম; বরং পাল্টা-কৌশল ও প্রযুক্তিগত অভিযোজনই নির্ধারণ করবে সংঘাতের পরবর্তী ধাপ।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর