শান্তিপূর্ণভাবে ICE কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ: আইন এবং মানবাধিকারের লড়াই

মিনেসোটার উপশহরে এক মা-বেকি রিংস্ট্রমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যিনি শান্তিপূর্ণভাবে ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছিলেন। গ্রেপ্তারের ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার বিষয়।

PostImage

শান্তিপূর্ণভাবে ICE কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ: আইন এবং মানবাধিকারের লড়াই


যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনবিরোধী অভিযানে নজরদারির অভিযোগে গ্রেপ্তার বৃদ্ধি: মিনেসোটায় মা-এর আটক ঘিরে বিতর্ক

মিনিয়াপোলিস (যুক্তরাষ্ট্র):
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আইন প্রয়োগের বিরোধিতা ও নজরদারির অভিযোগে ফেডারেল আইন ব্যবহার করে গ্রেপ্তার ও মামলা দেওয়ার সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। মিনেসোটার এক গৃহবধূকে নাটকীয়ভাবে গ্রেপ্তারের ঘটনা নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে—এটি কি আইন প্রয়োগ, নাকি মতপ্রকাশ দমনের কৌশল?

গত ২৯ জানুয়ারি মিনিয়াপোলিসের উপশহরে ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছিলেন বেকি রিংস্ট্রম (৪২)। ধূসর রঙের কিয়া এসইউভি চালিয়ে তিনি প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে একদল অভিবাসন কর্মকর্তাকে অনুসরণ করেন বলে জানান। তিনি দাবি করেন, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেই গাড়ি চালাচ্ছিলেন।

হঠাৎ করেই তার গাড়িটিকে একাধিক নম্বরবিহীন যানবাহন দিয়ে ঘিরে ফেলে ফেডারেল কর্মকর্তারা। মুখোশধারী অন্তত ছয়জন এজেন্ট গাড়ি থেকে নেমে তাকে গ্রেপ্তার করেন। প্রত্যক্ষদর্শীর ভিডিওতে দেখা যায়, এক কর্মকর্তা ধাতব বস্তু দিয়ে তার গাড়ির উইন্ডশিল্ডে আঘাত করেন, যেন জানালা ভাঙার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ভিডিওটি পরে রয়টার্স যাচাই করে নিশ্চিত করে।

‘আইন প্রয়োগে বাধা’ অভিযোগ

গ্রেপ্তারের পর সাত সন্তানের মা রিংস্ট্রমকে মিনিয়াপোলিসের বিশপ হেনরি হুইপল ফেডারেল বিল্ডিংয়ে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে একটি সাইটেশন দেওয়া হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের Title 18, Section 111 আইনের আওতায় অভিযোগ আনা হয়—যা ফেডারেল কর্মকর্তার কাজে বাধা দেওয়া, ভয় দেখানো বা হস্তক্ষেপ করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে।

এই আইনে অভিযোগ হলে তা মিসডিমিনার বা ফৌজদারি—উভয়ভাবেই আনা যেতে পারে। ফৌজদারি অপরাধে সর্বোচ্চ ২০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে, যদিও ৮ বছরের বেশি সাজা সাধারণত মারাত্মক অস্ত্র ব্যবহার বা শারীরিক ক্ষতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

রিংস্ট্রম বলেন, গ্রেপ্তারের সময় তিনি চরম ভীত ছিলেন।
“এক মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল, আমার পরিণতিও হয়তো রেনি গুডের মতো হতে পারে,”—বলেন তিনি। রেনি গুড ছিলেন মিনিয়াপোলিসে জানুয়ারিতে ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের গুলিতে নিহত দুই মার্কিন নাগরিক প্রতিবাদকারীর একজন।

রেকর্ড সংখ্যক মামলা

রয়টার্সের ফেডারেল আদালতের নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত গ্রীষ্মে শহরভিত্তিক অভিবাসন অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে ট্রাম্প প্রশাসন অন্তত ৬৫৫ জনকে এই আইনে অভিযুক্ত করেছে। যা ২০২৪–২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।

এই সংখ্যা দেশজুড়ে হলেও কতজনের মামলা সরাসরি অভিবাসন অভিযানের সঙ্গে সম্পর্কিত, কতগুলো ফৌজদারি, বা কয়টিতে দণ্ড হয়েছে—তা নির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি। রয়টার্স কিছু ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তথ্য শ্রেণিবিন্যাস করেছে, যেখানে নির্ভুলতার হার ছিল ৯৮ শতাংশ।

প্রশাসনের অবস্থান

হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের মুখপাত্র ট্রিসিয়া ম্যাকলাফলিন বলেন,
“আইন প্রয়োগে বাধা দেওয়া একটি গুরুতর অপরাধ। আমাদের কর্মকর্তারা নিজেদের, জনসাধারণ এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় ন্যূনতম বলপ্রয়োগ করেছেন।”

তিনি দাবি করেন, রিংস্ট্রম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ‘স্টক’ করছিলেন এবং দায়িত্ব পালনে বাধা দিচ্ছিলেন।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যাবিগেইল জ্যাকসন বলেন, প্রশাসন মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, তবে “যারা আইন প্রয়োগে বাধা দেবে, তাদের আইনের পূর্ণ কঠোরতার মুখোমুখি হতে হবে।”

নজরদারি ও ডাটাবেস বিতর্ক

আইসিই (ICE)-এর দুই কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, সংস্থাটি কয়েক মাস ধরে অভিবাসন অভিযানের বিরোধিতা করা ব্যক্তিদের নাম, ছবি, লাইসেন্স প্লেট ও আচরণের তথ্য একটি অভ্যন্তরীণ ডাটাবেসে সংরক্ষণ করছে। উদ্দেশ্য—ধরণ শনাক্ত করে ভবিষ্যতে অভিযোগ আনা।

তবে DHS দাবি করেছে, তারা কোনো ‘ডোমেস্টিক টেররিস্ট’ ডাটাবেস রাখে না, যদিও হুমকি ও বাধার ঘটনা নজরদারিতে থাকে।

আইনজ্ঞদের প্রশ্ন

দক্ষিণ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক সেথ স্টটন বলেন,
“এই আইন সাধারণত কর্মকর্তাদের ওপর সরাসরি হামলার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। কেবল দূরত্ব বজায় রেখে গাড়িতে অনুসরণ করাকে ‘জোরপূর্বক বাধা’ বলা আইনগতভাবে দুর্বল।”

উল্লেখ্য, মিনিয়াপোলিসের এক ফেডারেল বিচারক জানুয়ারির মাঝামাঝি এক আদেশে বলেন, “যথাযথ দূরত্বে আইসিইকে অনুসরণ করা” গ্রেপ্তার বা গাড়ি থামানোর যথেষ্ট কারণ নয়। যদিও আপিল আদালত ১০ দিন পর সেই আদেশ স্থগিত করে।

অস্ত্র তাক করা ও ভয়ভীতি অভিযোগ

রয়টার্স যাচাইকৃত একাধিক ভিডিওতে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আইসিই কর্মকর্তারা অনুসরণকারী গাড়ির দিকে অস্ত্র তাক করছেন।

২৯ জানুয়ারি মিনিয়াপোলিসের দক্ষিণে এক ঘটনায়, ড্যাশক্যাম ফুটেজে দেখা যায়—ফেডারেল কর্মকর্তারা হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে পেছনের গাড়ির দিকে বন্দুক তাক করে এগিয়ে যান। আইসিই দাবি করেছে, ওই চালক বেপরোয়া ছিলেন, যদিও রয়টার্স তা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

‘ভয় দেখানোর কৌশল’ অভিযোগ

স্টেট পলের উত্তরে এক ঘটনায়, এক আইসিই কর্মকর্তা এক নারীকে তার বাড়ি পর্যন্ত অনুসরণ করেন। ভিডিওতে শোনা যায়, কর্মকর্তাটি বলেন—
“তুমি গলা চড়ালে, আমি তোমার কণ্ঠ মুছে দেব।”

এক আইসিই কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, কখনো কখনো লাইসেন্স প্লেট দেখে অনুসরণকারীদের বাড়ি পর্যন্ত গিয়ে “ভয় দেখানো হয়”।

মানবাধিকার উদ্বেগ

সাবেক আইসিই কর্মকর্তা ডেবোরা ফ্লাইশাকার বলেন,
“শান্তিপূর্ণভাবে অভিবাসন কর্মকর্তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা অপরাধ নয়। এটি ভয় দেখানো ও অসাংবিধানিক।”

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর