নারী নেতৃত্ব কি কোরআন নিষিদ্ধ করেছে, নাকি ব্যাখ্যাই নিষেধ তৈরি করেছে?
নারী নেতৃত্ব ইসলামে নিষিদ্ধ—এই বক্তব্য যতটা ধর্মীয় মনে হয়, বাস্তবে তা ততটাই ব্যাখ্যাগত ও রাজনৈতিক। কোরআনের পাঠ, ইসলামের ইতিহাস এবং বর্তমান বাস্তবতা সেই দাবিকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
নারী নেতৃত্ব কি কোরআন নিষিদ্ধ করেছে, নাকি ব্যাখ্যাই নিষেধ তৈরি করেছে?
আশিকুর রহমান, ঢাকা : ইসলামে নারী নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামীর একজন নারী বিষয়ক সম্পাদক কোরআনের একটি আয়াত উদ্ধৃত করে দাবি করেছেন যে ইসলামে নারী নেতৃত্ব নিষিদ্ধ। তিনি যে আয়াতটি উল্লেখ করেছেন তা হলো:
“আল-রিজালু ক্বাওয়্যামূনা ‘আলান-নিসা” (সূরা নিসা ৪:৩৪)।
প্রশ্ন হলো, এই আয়াতটি কি আদৌ নারী নেতৃত্বের প্রশ্নে নাজিল হয়েছে, নাকি এর প্রেক্ষাপট ভিন্ন?
আয়াতের মূল প্রেক্ষাপট
তাফসির ও শানে নুযূল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই আয়াতটি মূলত পারিবারিক বিরোধের প্রেক্ষিতে নাজিল হয়েছে। বর্ণনা অনুযায়ী, এক সাহাবি তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন এবং একপর্যায়ে স্ত্রীকে আঘাত করেন। স্ত্রী বিষয়টি নিয়ে রাসূল (সা.)-এর কাছে অভিযোগ করলে তিনি শাস্তির নির্দেশ দিতে উদ্যত হন। ঠিক সেই প্রেক্ষাপটেই সংশ্লিষ্ট আয়াতটি নাজিল হয়।
অতএব, এই আয়াতের বিষয়বস্তু পারিবারিক দায়িত্ব, ভরণ-পোষণ এবং ন্যায়বিচার সংক্রান্ত। এখানে কোথাও রাজনৈতিক নেতৃত্ব, রাষ্ট্রক্ষমতা বা নারী-পুরুষের সার্বিক অধীনতার প্রশ্ন নেই। বরং এই আয়াতের মাধ্যমে পুরুষের ওপর দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে, ক্ষমতা নয়। সংসারে বিশৃঙ্খলা হলে পুরুষ দায় এড়াতে পারবে না—এই দায়িত্ববোধই এখানে মুখ্য।
যদি এই আয়াত নারীকে পুরুষের অধীন করত, তাহলে রাসূল (সা.) কখনোই পুরুষের শাস্তির বিধান দিতে উদ্যত হতেন না।
বাস্তবতা হলো, কোরআনে নারী নেতৃত্ব নিষিদ্ধ বলে কোনো সুস্পষ্ট আয়াত নেই। আবার সুস্পষ্টভাবে অনুমোদনের কথাও নেই। এই শূন্যস্থানেই মূলত ব্যাখ্যাগত বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
হাদিস ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
একটি হাদিসে বলা হয়েছে:
“যে জাতি নারীর হাতে নেতৃত্ব দেয়, তারা সফল হবে না।”
অনেক ইসলামি চিন্তাবিদ মনে করেন, এটি একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বলা হয়েছিল—বিশেষত পারস্য সাম্রাজ্যে রাজতন্ত্রের উত্তরাধিকার সংকটের সময়। ফলে এটিকে সার্বজনীন ও চিরস্থায়ী বিধান হিসেবে নেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা প্রশ্নবিদ্ধ।
ইসলামের ইতিহাসে নারীর ভূমিকা পর্যালোচনা করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়।
সাবা জাতির রানি বিলকিস: তাঁর শাসনকে কোরআনে নিন্দা করা হয়নি; বরং প্রজ্ঞা ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রশংসিত।
শিফা বিনতে আবদুল্লাহ (রা.): মদিনার বাজার তদারকির দায়িত্বে ছিলেন, যা প্রশাসনিক নেতৃত্বের প্রতীক।
আয়েশা (রা.): হাদিস, ফিকহ ও রাজনৈতিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য; বহু সাহাবির শিক্ষক ছিলেন।
খাদিজা (রা.): অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন ও সিদ্ধান্তপ্রধান।
এই উদাহরণগুলো দেখায়, ইসলামের ব্যবহারিক জীবনে নারী নেতৃত্বের সুযোগ ছিল এবং কার্যকরভাবে প্রয়োগ হয়েছে।
কোরআন ও অধিকার
কোরআনে বলা হয়েছে:
“তাদের জন্য রয়েছে তাদের অধিকার, যেমন তাদের ওপর রয়েছে কর্তব্য।” (সূরা বাকারা ২:২২৮)
এবং:
“মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের সহায়ক।” (সূরা আত-তাওবা ৯:৭১)
সহায়ক হওয়ার অর্থ অধীনতা নয়। বরং প্রেক্ষাপটভেদে পারস্পরিক দায়িত্ব ও অংশীদারিত্ব এখানে মুখ্য।
রাজনৈতিক বাস্তবতা ও দ্বন্দ্ব
এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীর নারী বিষয়ক সম্পাদকের বক্তব্য নিয়ে কিছু প্রশ্ন আসে।
ইসলামে যদি নারী নেতৃত্ব সত্যিই নিষিদ্ধ হয়, তাহলে তিনি নিজে কি সেই নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করছেন না? কারণ মিডিয়ার সামনে বক্তব্য দেওয়া, জাতিকে পথ দেখানো—এসবই নেতৃত্বের অংশ।
নারী বিষয়ক সম্পাদক পদও একটি নেতৃত্বমূলক অবস্থান। যদি নারী নেতৃত্ব নিষিদ্ধ হয়, তাহলে এই পদে নারীর থাকার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
রাষ্ট্র ও আইনের দিক থেকেও প্রশ্ন আসে।
জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন একসময় বাতিল ছিল, পরে পুনর্বহাল হয়েছে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সব স্তরে অন্তত ৩৩% নারী প্রতিনিধিত্ব বাধ্যতামূলক।
কোনো দল যদি আদর্শগতভাবে নারী নেতৃত্ব অস্বীকার করে, তাহলে শুধু আমির পদ নয়, দলের বিভিন্ন পর্যায়ে নারী নেতৃত্বেও আইনের লঙ্ঘন হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। যেখানে আইনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যায় এবং কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় না, সেখানে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে জনগণের আস্থা প্রভাবিত হয়।
ইসলামে নারী নেতৃত্বের প্রশ্নটি সুস্পষ্ট ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার চেয়ে ব্যাখ্যার ওপর বেশি নির্ভরশীল। কোরআন, হাদিস, ইসলামের ইতিহাস এবং সমসাময়িক বাস্তবতা একত্রে বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয় যে নারী নেতৃত্ব ইসলামের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক নয়।