বিশ্ব বাণিজ্যের এক-তৃতীয়াংশে নতুন সমীকরণ

প্রায় দুই দশক আলোচনার পর ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছেছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের এক-তৃতীয়াংশকে প্রভাবিত করতে পারে

PostImage

বিশ্ব বাণিজ্যের এক-তৃতীয়াংশে নতুন সমীকরণ


নয়াদিল্লি (এপি) — প্রায় দুই দশক ধরে চলা আলোচনার পর ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) মঙ্গলবার একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছেছে, যা প্রায় ২ বিলিয়ন মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে

ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান এই চুক্তিকে আখ্যা দিয়েছেন “মাদার অব অল ডিলস” বা “সব চুক্তির জননী” হিসেবে। এই চুক্তির আওতায় ইইউর ২৭টি সদস্য রাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে প্রায় সব পণ্যের ওপর মুক্ত বাণিজ্য কার্যকর হবে—টেক্সটাইল থেকে শুরু করে ওষুধ পর্যন্ত। এতে ইউরোপীয় মদ ও গাড়ির ওপর ভারতের উচ্চ আমদানি শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। তবে চুক্তিটি কার্যকর হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

বিশ্বের দুই বৃহত্তম বাজারের মধ্যে এই সমঝোতা এমন এক সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ভারত ও ইইউ—উভয়ের ওপরই উচ্চ শুল্ক আরোপ করছে। এর ফলে প্রচলিত বাণিজ্য কাঠামো ভেঙে পড়ছে এবং বড় অর্থনীতিগুলো বিকল্প অংশীদার খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক ভার্চুয়াল ভাষণে বলেন,
“এই চুক্তি ভারত ও ইউরোপের জনগণের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করবে। এটি বৈশ্বিক জিডিপির ২৫ শতাংশ এবং বিশ্বের মোট বাণিজ্যের এক-তৃতীয়াংশকে প্রতিনিধিত্ব করে।”

ভারত ও ইইউ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারে একটি কাঠামোতেও সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি দক্ষ কর্মী ও শিক্ষার্থীদের চলাচল সহজ করতে একটি পৃথক চুক্তি হয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয়—এই অংশীদারত্ব কেবল বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।


বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চুক্তির গুরুত্ব

“শেষ পর্যন্ত, এই চুক্তির লক্ষ্য হলো এমন এক সময়ে বিশ্বের দুই বৃহৎ বাজারের মধ্যে একটি স্থিতিশীল বাণিজ্যিক করিডর তৈরি করা, যখন বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে,” বলেন ভারতের বাণিজ্য বিশ্লেষক অজয় শ্রীবাস্তব।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের মিত্রতার সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখনো আটলান্টিকের ওপার থেকে আসা আগ্রাসী অবস্থানের ধাক্কা সামলাতে ব্যস্ত। ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চ শুল্ক আরোপ, ইউরোপের চরম ডানপন্থী দলগুলোর প্রতি সমর্থন এবং ডেনমার্কের আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কঠোর অবস্থানের কারণে ইউরোপজুড়ে এক ধরনের বিশ্বাসভঙ্গের অনুভূতি তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ব্রাসেলস বিশ্বজুড়ে নতুন বাজারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে। গত এক বছরে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন জাপান, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো ও দক্ষিণ আমেরিকার সঙ্গে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন, যা তিনি “কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন” (Strategic Autonomy) নামে বর্ণনা করেছেন। বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোরই একটি রূপ।


যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক চাপ ও ভারতের কৌশল

ভারতও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্কের প্রভাব মোকাবিলায় রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্য করার কৌশল নিয়েছে। রাশিয়া থেকে ছাড়মূল্যে তেল কেনা অব্যাহত রাখায় ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। এতে মোট শুল্ক দাঁড়িয়েছে ৫০ শতাংশে

ইইউর জন্য এই চুক্তি বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল বড় অর্থনীতিগুলোর একটিতে প্রবেশাধিকার বাড়াবে এবং ইউরোপীয় রপ্তানিকারক ও বিনিয়োগকারীদের তুলনামূলকভাবে অস্থির বাজারের ওপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করবে।

জার্মান মার্শাল ফান্ডের সিনিয়র ফেলো গরিমা মোহন বলেন,
“এটি ভারতের স্বাক্ষর করা সবচেয়ে ব্যাপক বাণিজ্য চুক্তি। এতে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো প্রথম প্রবেশকারীর সুবিধা পাবে এবং অন্য প্রতিযোগীদের তুলনায় কৌশলগত বাড়তি সুবিধা অর্জন করবে।”


শুল্ক হ্রাস ও বাজার উন্মুক্তকরণ

২০২৪–২৫ অর্থবছরে ভারত ও ইইউর মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৩৬.৫ বিলিয়ন ডলার। ২০৩০ সালের মধ্যে তা ২০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে দুই পক্ষ।

চুক্তির আওতায় গাড়ি, মদ ও হুইস্কির জন্য একটি কোটা ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার ফলে উচ্চ শুল্ক কমবে।

ইউরোপীয় কমিশন জানায়, ইইউতে তৈরি গাড়ির ওপর ভারতের শুল্ক ধীরে ধীরে ১১০ শতাংশ থেকে কমে ১০ শতাংশে নামবে। গাড়ির যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে পুরোপুরি তুলে নেওয়া হবে।
এছাড়া যন্ত্রপাতির ওপর ৪৪ শতাংশ, রাসায়নিক পণ্যের ওপর ২২ শতাংশ এবং ওষুধের ওপর ১১ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কও বড় অংশে তুলে নেওয়া হবে।

ইউরোপীয় প্রিমিয়াম ওয়াইনের ক্ষেত্রে ভারতের শুল্ক ১৫০ শতাংশ থেকে কমে ২০ শতাংশে নামবে।

তবে ভারত দুধ ও চিজসহ দুগ্ধজাত পণ্য এবং শস্য চুক্তির বাইরে রেখেছে—যাকে “দেশীয় সংবেদনশীলতা” হিসেবে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে, ইইউ ভারতীয় চিনি, মাংস, পোলট্রি ও গরুর মাংসের ওপর শুল্ক ছাড় দিতে রাজি হয়নি।


অর্থনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ

উরসুলা ফন ডার লেয়েন বলেন, এই চুক্তি হলো “দুই দৈত্যাকার অর্থনীতির অংশীদারত্বের গল্প,” যা প্রকৃত অর্থেই একটি উইন-উইন সমাধান। তিনি আরও বলেন, এটি প্রমাণ করে যে “বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহযোগিতাই সেরা উত্তর।”

এই চুক্তি দুই অর্থনীতির মধ্যে সরবরাহ শৃঙ্খল আরও গভীরভাবে সংযুক্ত করবে, যৌথ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াবে এবং বছরে প্রায় ৪ বিলিয়ন ইউরো শুল্ক সাশ্রয় করবে। পাশাপাশি ভারত ও ইউরোপে লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

চুক্তিটি চূড়ান্তভাবে স্বাক্ষরিত হতে পারে চলতি বছরের শেষ দিকে, আইনি বিষয়গুলো চূড়ান্ত হওয়া এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অনুমোদনের পর। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল জানিয়েছেন, বছরের শেষ নাগাদ এটি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী, ভারত ইইউর ৯৬.৬ শতাংশ রপ্তানির ওপর শুল্ক কমাবে বা তুলে নেবে, আর ইইউ ধাপে ধাপে ভারতের প্রায় ৯৯ শতাংশ রপ্তানির ওপর একই সুবিধা দেবে।

ভারতের যে খাতগুলো সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে টেক্সটাইল, পোশাক, প্রকৌশল পণ্য, চামড়া, হস্তশিল্প, জুতা ও সামুদ্রিক পণ্য। অপরদিকে, ইউরোপের লাভ হবে মূলত মদ, গাড়ি, রাসায়নিক ও ওষুধ শিল্পে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর