ভারত–ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্তের পথে শুল্ক, সেবা ও ভূরাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত

ভূরাজনৈতিক চাপ ও বৈশ্বিক বাণিজ্য ঝুঁকি ভারত ও ইইউকে একটি বাস্তবসম্মত সমঝোতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। তবে এই চুক্তি বাস্তবে কতটা লাভজনক হবে, তা নির্ভর করবে কার্বন কর, সেবা খাতে প্রবেশাধিকার এবং অশুল্ক বাধাগুলো কীভাবে মোকাবিলা করা হয়, তার ওপর।

PostImage

ভারত–ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্তের পথে শুল্ক, সেবা ও ভূরাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত


নয়াদিল্লি, ২৬ জানুয়ারি: দীর্ঘদিনের আলোচনার পর অবশেষে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) চূড়ান্তের কাছাকাছি পৌঁছেছে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ভারত–ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে এই চুক্তি নিয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

বিশ্ব বাণিজ্যে যখন সুরক্ষাবাদ বাড়ছে এবং বড় অর্থনীতিগুলো নতুন করে শুল্ক আরোপ করছে, তখন এই চুক্তিকে ভারত ও ইইউ—উভয়ের জন্যই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।


চুক্তি কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়া

চুক্তিটি স্বাক্ষরের পর ইউরোপীয় পার্লামেন্টে অনুমোদন পেতে হবে। এই অনুমোদন প্রক্রিয়া শেষ হতে কমপক্ষে এক বছর সময় লাগতে পারে। তবে সম্প্রতি ইইউ–দক্ষিণ আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তিকে ঘিরে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আইনি আপত্তি ওঠায়, ভারত–ইইউ চুক্তির অনুমোদনও বিলম্বিত বা জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

এই এফটিএর আওতায় মূলত পণ্য, সেবা ও বাণিজ্য সংক্রান্ত নীতিমালা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
তবে বিনিয়োগ সুরক্ষা ও ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) বিষয়গুলো আলাদাভাবে আলোচনা করা হচ্ছে।


কেন এই চুক্তি এখন গুরুত্বপূর্ণ

গত চার বছরে এটি ভারতের নবম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হতে যাচ্ছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যে যখন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ শুল্ক বাড়াচ্ছে, তখন নতুন বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাই ভারতের প্রধান লক্ষ্য।

অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই চুক্তিকে চীননির্ভরতা কমানোর একটি কার্যকর উপায় হিসেবে দেখছে। পাশাপাশি দ্রুত বর্ধনশীল ৪.২ ট্রিলিয়ন ডলারের ভারতীয় অর্থনীতিতে নিজেদের উপস্থিতি জোরদার করতে চায় ইইউ।


ভারতের সম্ভাব্য লাভ

ইইউ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে ভারতের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য অংশীদার।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে ভারত–ইইউ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৯০ বিলিয়ন ডলারের বেশি

  • ভারতের রপ্তানি:

    • পণ্য: প্রায় ৭৬ বিলিয়ন ডলার

    • সেবা: প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার

ইইউতে গড় শুল্কহার কম (৩.৮ শতাংশ) হলেও, টেক্সটাইল ও পোশাক খাতে শুল্ক প্রায় ১০ শতাংশ, যা শ্রমঘন খাতের জন্য বড় বাধা।

২০২৩ সালে ইইউ যখন জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স (GSP) সুবিধা প্রত্যাহার শুরু করে, তখন ভারতীয় পোশাক, ওষুধ ও যন্ত্রপাতি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই চুক্তি সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্কনীতির প্রেক্ষাপটে।

ভারত একই সঙ্গে চাইছে—

  • আইটি ও পেশাজীবী সেবার বাজারে সহজ প্রবেশাধিকার

  • ইউরোপে ভারতীয় পেশাজীবীদের চলাচলে বাধা কমানো


ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্ভাব্য লাভ

ইইউ থেকে ভারতে রপ্তানির ক্ষেত্রে গড় শুল্কহার প্রায় ৯.৩ শতাংশ
২০২৪–২৫ সালে ইইউ ভারতে পণ্য রপ্তানি করেছে প্রায় ৬০.৭ বিলিয়ন ডলার

বিশেষ করে—

  • গাড়ি ও অটো পার্টস

  • কেমিক্যাল ও প্লাস্টিক
    খাতে শুল্ক তুলনামূলক বেশি।

শুল্ক হ্রাস পেলে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য ভারতের বাজারে গাড়ি, যন্ত্রপাতি, বিমান ও রাসায়নিক পণ্যের রপ্তানি বাড়বে। পাশাপাশি ভারতের সেবা খাত ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রেও প্রবেশাধিকার বাড়তে পারে।


প্রধান মতবিরোধের জায়গা

  • কৃষি ও দুগ্ধখাত চুক্তির বাইরে রাখা হয়েছে

  • ইইউ চাইছে ৯৫ শতাংশ পণ্যে শুল্ক শূন্য করতে, ভারত রাজি প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত

  • গাড়ি, ওয়াইন ও মদ খাতে ভারত ধাপে ধাপে বা কোটা ভিত্তিক শুল্ক ছাড় দিতে চায়

ভারতের যুক্তি, হঠাৎ বড় পরিসরে শুল্ক কমালে দেশীয় শিল্প ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভূরাজনৈতিক চাপ ও বৈশ্বিক বাণিজ্য ঝুঁকি ভারত ও ইইউকে একটি বাস্তবসম্মত সমঝোতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। তবে এই চুক্তি বাস্তবে কতটা লাভজনক হবে, তা নির্ভর করবে কার্বন কর, সেবা খাতে প্রবেশাধিকার এবং অশুল্ক বাধাগুলো কীভাবে মোকাবিলা করা হয়, তার ওপর।