বাংলাদেশ, সোমালিয়া, নাইজেরিয়াসহ ৭৫ দেশের ভিসা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্র
বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার স্বপ্নে বড় ধাক্কা এলো। যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৭৫টি দেশের সব ধরনের অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, যেসব আবেদনকারী ভবিষ্যতে সরকারি কল্যাণ সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হতে পারেন—তাদের প্রবেশ ঠেকাতেই এই কড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ, সোমালিয়া, নাইজেরিয়াসহ ৭৫ দেশের ভিসা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্র
ওয়াশিংটন — যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর (স্টেট ডিপার্টমেন্ট) এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্তে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসী ভিসা প্রসেসিং সম্পূর্ণভাবে স্থগিত করেছে। এই স্থগিতাদেশ কার্যকর হচ্ছে ২১ জানুয়ারি থেকে, এবং তা অনির্দিষ্টকালের জন্য বলবৎ থাকবে।
ফক্স নিউজ ডিজিটাল প্রথম যে স্টেট ডিপার্টমেন্টের অভ্যন্তরীণ মেমো প্রকাশ করেছে, তাতে কনস্যুলার কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—বিদ্যমান অভিবাসন আইনের আওতায় ভিসা আবেদন সরাসরি প্রত্যাখ্যান করতে, যতদিন না নতুন করে স্ক্রিনিং ও ভেটিং পদ্ধতি পর্যালোচনা শেষ হয়।
বাংলাদেশসহ কোন কোন দেশ তালিকায়
এই স্থগিতাদেশে যেসব দেশ সরাসরি প্রভাবিত হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে—
বাংলাদেশ, সোমালিয়া, রাশিয়া, ইরান, আফগানিস্তান, ব্রাজিল, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, ইরাক, মিসর, ইয়েমেন, সুদান, সিরিয়াসহ মোট ৭৫টি দেশ।
বাংলাদেশ এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় পারিবারিক অভিবাসন, ডাইভার্সিটি ভিসা (লটারি) ও অন্যান্য স্থায়ী ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
‘পাবলিক চার্জ’ নীতির নামে কঠোরতা
স্টেট ডিপার্টমেন্ট্মেন্ট জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি হলো অভিবাসন আইনের “পাবলিক চার্জ” ধারা। এই ধারার আওতায় এমন ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়, যাদের ভবিষ্যতে—
-
সরকারি ভাতা
-
কল্যাণ কর্মসূচি
-
স্বাস্থ্য বা সামাজিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে
২০২৫ সালের নভেম্বরে, বিশ্বের সব মার্কিন দূতাবাসে পাঠানো এক নির্দেশনায় কনস্যুলার কর্মকর্তাদের বলা হয়—ভিসা দেওয়ার আগে আবেদনকারীর নিচের বিষয়গুলো কঠোরভাবে যাচাই করতে:
-
শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য
-
বয়স
-
ইংরেজি ভাষা দক্ষতা
-
আর্থিক সক্ষমতা
-
ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার সম্ভাবনা
এমনকি অতীতে কেউ সরকারি নগদ সহায়তা, সরকারি আশ্রয় বা কোনো প্রতিষ্ঠানে থাকলেও সেটিকে নেতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
সোমালিয়া নিয়ে বাড়তি নজরদারি
তালিকাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সোমালিয়া বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যে সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ঘাটিত এক বিশাল কল্যাণ ভাতা জালিয়াতি কেলেঙ্কারি ফেডারেল কর্মকর্তাদের কড়া অবস্থান নিতে বাধ্য করে। ওই ঘটনায় জড়িতদের বড় অংশ ছিলেন সোমালি নাগরিক বা সোমালি-আমেরিকান।
স্টেট ডিপার্টমেন্টের স্পষ্ট বার্তা
স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র টমি পিগট এক বিবৃতিতে বলেন,
“যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের উদারতার অপব্যবহার করতে পারে—এমন সম্ভাব্য অভিবাসীদের অযোগ্য ঘোষণার জন্য পররাষ্ট্র দপ্তর তার দীর্ঘদিনের আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করবে।”
তিনি আরও বলেন,
“এই ৭৫টি দেশের অভিবাসন প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে, যাতে এমন বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ ঠেকানো যায় যারা ভবিষ্যতে কল্যাণ ভাতা ও সরকারি সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন।”
ব্যতিক্রম প্রায় নেই
স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, এই স্থগিতাদেশের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হবে অত্যন্ত সীমিত। কেবলমাত্র যেসব আবেদনকারী ‘পাবলিক চার্জ’ সংক্রান্ত সব যাচাই শতভাগ পাস করবেন, তারাই বিশেষ অনুমতিতে ছাড় পেতে পারেন।
আগের প্রশাসনের সঙ্গে পার্থক্য
২০২২ সালে বাইডেন প্রশাসনের সময় ‘পাবলিক চার্জ’ নীতির আওতা ছিল সীমিত। তখন—
-
ফুড স্ট্যাম্প (SNAP)
-
WIC
-
মেডিকেইড
-
হাউজিং ভাউচার
এসব সুবিধা বিবেচনায় নেওয়া হতো না।
কিন্তু বর্তমান সিদ্ধান্তে এই নীতি আবার ব্যাপকভাবে কঠোর করা হয়েছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের ২০১৯ সালের নীতির সঙ্গে মিল রাখে।
সম্ভাব্য প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে—
-
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর হাজারো পরিবার দীর্ঘ অনিশ্চয়তায় পড়বে
-
বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া চরমভাবে বিলম্বিত হবে
-
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি আরও কঠোর ও সীমাবদ্ধ হয়ে উঠবে
ইতোমধ্যে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই সিদ্ধান্তকে অমানবিক ও বৈষম্যমূলক বলে সমালোচনা শুরু করেছে।