পোস্টাল ব্যালটের বিন্যাস, প্রবাসী ভোট ও আচরণবিধি প্রয়োগে বৈষম্য
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পোস্টাল ব্যালটের নকশা, প্রবাসী ভোট ব্যবস্থাপনা এবং আচরণবিধি প্রয়োগে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি। দলটির দাবি, এসব বিষয় মিলিয়ে নির্বাচনে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর আলামত স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
পোস্টাল ব্যালটের বিন্যাস, প্রবাসী ভোট ও আচরণবিধি প্রয়োগে বৈষম্য
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রবাসী ভোটারদের জন্য ব্যবহৃত পোস্টাল ব্যালটের নকশা, আচরণবিধি প্রয়োগে অসমতা এবং প্রার্থিতা যাচাই প্রক্রিয়ায় অস্পষ্টতা—সব মিলিয়ে নির্বাচনের পরিবেশে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর আলামত প্রকাশ পাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। এসব বিষয়কে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও কৌশলগত পক্ষপাত হিসেবে আখ্যায়িত করে নির্বাচন কমিশনের কাছে তাৎক্ষণিক সংশোধন ও ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে দলটি।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব অভিযোগ তুলে ধরেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান নজরুল ইসলাম খান।
পোস্টাল ব্যালটে ‘কৌশলগত পক্ষপাত’-এর অভিযোগ
নজরুল ইসলাম খান বলেন, প্রবাসী ভোটারদের কাছে পাঠানো পোস্টাল ব্যালটে প্রার্থী ও প্রতীকের নাম যেভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে, তাতে তিনটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতীক প্রথম লাইনে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান, অথচ বিএনপির প্রতীক এমন স্থানে রাখা হয়েছে যে কাগজ ভাঁজ করলে সেটি চোখে পড়ে না।
তার ভাষায়, “এটি কাকতালীয় ঘটনা বলে কেউ কেউ মনে করতে পারেন, কিন্তু আমাদের মতে এটি পরিকল্পিতভাবেই করা হয়েছে।”
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, ব্যালট পেপারে পাঁচটি কলাম ও ১৪টি সারি ব্যবহারের ফলে এই বিশেষ বিন্যাস তৈরি হয়েছে। অথচ কলাম ছয়টি বা সারি ১২ বা ১৬টি করা হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না। “এ কারণেই আমরা বলছি, এটি একটি নির্বাচনী কৌশল, যা ভোটারদের মানসিকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।”
বিএনপি কমিশনের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে—বিদেশে পাঠানো পোস্টাল ব্যালটে যদি সংশোধনের সুযোগ থাকে, তা করতে হবে এবং দেশের ভেতরে যেসব পোস্টাল ব্যালট এখনো বিতরণ হয়নি, সেগুলো অবশ্যই সংশোধন করতে হবে, যাতে একই কৌশল পুনরায় প্রয়োগ না হয়।
আচরণবিধি প্রয়োগে বৈষম্য, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রশ্নবিদ্ধ
নির্বাচনী আচরণবিধি প্রয়োগের ক্ষেত্রেও দ্বৈত মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন নজরুল ইসলাম খান। তিনি বলেন,
“প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বিএনপি প্রার্থীদের বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাচন অফিস থেকে নোটিশ পাঠানো হচ্ছে। অথচ ঢাকাসহ বড় বড় এলাকায় অন্য দল প্রকাশ্যে আচরণবিধি ভঙ্গ করলেও কমিশনের কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা আমরা দেখছি না।”
তার অভিযোগ, একটি বিশেষ দলের পক্ষে কয়েকটি রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে প্রচারণা চালালেও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে না। এতে করে নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য বড় হুমকি।
বাহরাইনে পোস্টাল ব্যালট বিতরণে অনিয়ম
প্রবাসী ভোটে অনিয়মের আরেকটি উদাহরণ হিসেবে বাহরাইনের ঘটনার কথা উল্লেখ করেন বিএনপির এই নেতা। তিনি জানান, সেখানে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের নেতাদের হাতে একাধিক পোস্টাল ব্যালট থাকার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে এবং বাহরাইনে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে তদন্ত শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি সত্য বলে জানা গেছে এবং তদন্ত শেষে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
দ্বৈত নাগরিকত্ব: আইনি অস্পষ্টতায় প্রার্থী বাতিল
দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত জটিলতায় প্রার্থী বাতিলের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে বিএনপি। নজরুল ইসলাম খান বলেন, সংবিধান অনুযায়ী নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে কেউ নির্বাচনের যোগ্য হন। আরপিও অনুযায়ী দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে তা হলফনামায় উল্লেখ করতে হয়।
কিন্তু বাস্তবে হলফনামায় কেবল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ অপশন রাখা হয়েছে, অতিরিক্ত ডকুমেন্ট দাখিলের কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। এই অস্পষ্টতার সুযোগে কিছু রিটার্নিং অফিসার প্রার্থিতা বাতিল করছেন, যা আইনের সমান প্রয়োগের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তিনি উল্লেখ করেন, একই কারণে জামায়াতে ইসলামীর দু’জন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। বিএনপির মতে, তাদেরও রিভিউ বা পুনর্বিবেচনার সুযোগ দেওয়া উচিত।
আইন প্রয়োগ ও গণভোট প্রসঙ্গ
নির্বাচনে কারচুপির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার যে ঘোষণা নির্বাচন কমিশন দিয়েছে—এনআইডি ও ভোটার আইডি ব্লক করা—সে বিষয়ে বিএনপি বলেছে, যারা সত্যিই নির্বাচনকে বিঘ্নিত করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধেই যেন আইন প্রয়োগ করা হয়।
সংস্কার ও গণভোট প্রসঙ্গে নজরুল ইসলাম খান বলেন, “বিএনপি শুরু থেকেই সংস্কারের পক্ষে। গণভোট হলে আমরা ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষেই থাকব।”
বিএনপির প্রতিনিধি দল
সিইসির সঙ্গে বৈঠকে বিএনপির প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা কাউন্সিল সদস্য ইসমাইল জবিউল্লাহ, নির্বাচন কমিশনের সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ জকরিয়াসহ দলের অন্যান্য নেতারা।