ভারতীয়দের পর্যটক ভিসা সীমিত করল বাংলাদেশ: দ্বিপাক্ষিক টানাপোড়েনে ক্ষতির ভার কার ঘাড়ে?

বিশ্লেষণে স্পষ্ট, ভারতীয়দের জন্য বাংলাদেশের পর্যটক ভিসা সীমিত হওয়ায় ভারতের ক্ষতি সীমিত থাকলেও, বাংলাদেশ শিক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যবসা—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়ছে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এই টানাপোড়েন অব্যাহত থাকলে, দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব দুই দেশের সাধারণ জনগণের ওপরই পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

PostImage

ভারতীয়দের পর্যটক ভিসা সীমিত করল বাংলাদেশ: দ্বিপাক্ষিক টানাপোড়েনে ক্ষতির ভার কার ঘাড়ে?


বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কে চলমান অস্থিরতার মধ্যেই ভারতীয় নাগরিকদের জন্য বাংলাদেশের পর্যটক ভিসা দেওয়া সীমিত করা হয়েছে। কলকাতা, মুম্বাই ও চেন্নাইয়ে অবস্থিত বাংলাদেশের উপদূতাবাসগুলো থেকে বর্তমানে পর্যটক ভিসা ইস্যু করা হচ্ছে না। এর আগে দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশন এবং আগরতলায় অ্যাসিস্ট্যান্ট হাই কমিশনারের দপ্তর থেকেও ভিসা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বর্তমানে কেবল গুয়াহাটিতে অবস্থিত বাংলাদেশ অ্যাসিস্ট্যান্ট হাই কমিশনারের দপ্তর থেকেই সীমিত আকারে ভারতীয় নাগরিকদের জন্য ভিসা দেওয়া হচ্ছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি, তবে বুধবার থেকে পর্যটক ভিসা দেওয়া যে সীমিত করা হয়েছে, তা নিশ্চিত করেছে কলকাতাস্থ বাংলাদেশ উপদূতাবাসের একাধিক সূত্র।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পর্যটক ভিসা সীমিত করা হলেও বাণিজ্যিক ভিসা, কূটনৈতিক ভিসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ক্যাটাগরির ভিসা কার্যক্রম চালু থাকবে।

ভিসা সংকটের পটভূমি

এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে গত বছরের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান। ওই গণআন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত চারটি ভারতীয় ভিসা সেন্টারে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ঢাকায় ভারতীয় ভিসা সেন্টারের সামনেও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।

এই পরিস্থিতিতে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে ভারত সাময়িকভাবে সব ধরনের ভিসা কার্যক্রম বন্ধ রাখে। পরে ভিসা সেন্টারগুলো চালু হলেও ভারত জানিয়ে দেয়—

মেডিকেল ভিসা এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটক ও সাধারণ ভিসা আপাতত ইস্যু করা হবে না।

বর্তমানে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভারতীয় পর্যটক ভিসা কার্যত পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

ভারতীয় পর্যটক ভিসা সীমিত: ভারতের ক্ষতি কতটা?

পর্যটন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে ভারতীয় পর্যটকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে সীমিত। সরকারি ও বেসরকারি পর্যটন খাতের তথ্য অনুযায়ী—

বাংলাদেশে আগত মোট বিদেশি পর্যটকের মধ্যে ভারতীয়দের অংশ আনুমানিক ১০ থেকে ১২ শতাংশ

অধিকাংশ ভারতীয় পর্যটক আসেন স্বল্প সময়ের জন্য

মাথাপিছু পর্যটন ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম

ফলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতীয় পর্যটক ভিসা সীমিত করা হলেও, ভারতের পর্যটন খাত বা সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই।

বাংলাদেশের জন্য কেন বড় ধাক্কা?

বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ভারতের ভিসা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বাংলাদেশ বহুমাত্রিক সংকটে পড়ছে।

উচ্চ শিক্ষা খাতে সংকট

প্রতিবছর আনুমানিক ৭০ থেকে ৮০ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করে

ভিসা বন্ধ থাকায় নতুন শিক্ষার্থীদের ভর্তি প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে

অনেক শিক্ষার্থী মাঝপথে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছেন না

চিকিৎসা খাতে সবচেয়ে বড় আঘাত

ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ রোগী যাতায়াত করতেন

সীমিত মেডিকেল ভিসা ও দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে রোগীদের বিকল্প দেশ (থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর) বেছে নিতে হচ্ছে

এতে চিকিৎসা ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে

ব্যবসা ও বাণিজ্যে স্থবিরতা

ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা নিয়মিত ভারত যাতায়াত করে কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও ব্যবসায়িক চুক্তি সম্পন্ন করতেন

ভিসা সংকটে সীমান্ত বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি সমন্বয় এবং অনানুষ্ঠানিক ব্যবসা মারাত্মকভাবে ব্যাহত

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের ভিসা সীমাবদ্ধতার সরাসরি আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতির ভার বহন করছে বাংলাদেশ।

কূটনৈতিক বার্তা ও বাস্তবতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এক অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,

“বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতীয় পর্যটক ভিসা সীমিত করা মূলত একটি কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং পারস্পরিকতার বার্তা। তবে বাস্তবতায় এটি ভারতের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে পারছে না।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর