চীনের বদলে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছে ভেনেজুয়েলার তেল
ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি বড় তেল রপ্তানি চুক্তি হয়েছে, যার আওতায় বিলিয়ন ডলার মূল্যের ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হবে। এই চুক্তি দুই দেশের সম্পর্কের পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
চীনের বদলে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছে ভেনেজুয়েলার তেল
ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি চুক্তি হয়েছে, যার আওতায় সর্বোচ্চ ২০০ কোটি ডলার মূল্যের ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা হবে। মঙ্গলবার এ তথ্য নিশ্চিত করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এই চুক্তিকে ট্রাম্প প্রশাসনের একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন ভেনেজুয়েলার তেল সরবরাহ চীনের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঘুরে যাবে, অন্যদিকে ভেনেজুয়েলাকে আরও গভীর উৎপাদন সংকট এড়াতে সহায়তা করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও ভেনেজুয়েলার প্রতিক্রিয়া
বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে ভেনেজুয়েলা সরকার ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানের প্রতি সাড়া দিচ্ছে। ট্রাম্প আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন—ভেনেজুয়েলা যদি মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর জন্য তাদের তেল খাত উন্মুক্ত না করে, তাহলে সামরিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
ট্রাম্প প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে যুক্তরাষ্ট্র ও বেসরকারি মার্কিন কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলার তেল শিল্পে “সম্পূর্ণ প্রবেশাধিকার” দিতে হবে।
তেল অবরোধ ও মাদুরোর গ্রেপ্তার
গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানির ওপর অবরোধ আরোপ করে। এর ফলে দেশটির লাখ লাখ ব্যারেল তেল ট্যাংকার ও স্টোরেজ ট্যাংকে আটকে পড়ে। এই চাপের মধ্যেই গত সপ্তাহান্তে মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে।
ভেনেজুয়েলার শীর্ষ কর্মকর্তারা মাদুরোর আটককে “অপহরণ” বলে অভিহিত করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দেশটির বিশাল তেল সম্পদ দখলের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছেন।
কত তেল যাবে যুক্তরাষ্ট্রে
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, ভেনেজুয়েলা ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ব্যারেল ‘নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত তেল’ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করবে।
তিনি লেখেন,
“এই তেল বাজারমূল্যে বিক্রি হবে এবং সেই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, যাতে এটি ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়।”
এই চুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইটকে। তেলগুলো সরাসরি জাহাজ থেকে নামিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দরে পাঠানো হবে বলে জানান ট্রাম্প।
চীনের বদলে যুক্তরাষ্ট্র
রয়টার্সের সূত্র অনুযায়ী, শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো তেলের একটি বড় অংশ মূলত চীনে যাওয়ার কথা ছিল। গত এক দশক ধরে, বিশেষ করে ২০২০ সালে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা জারির পর, চীন ছিল ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা।
একজন তেল শিল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেন,
“ট্রাম্প চান এটি দ্রুত কার্যকর হোক, যাতে তিনি এটিকে বড় রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে পারেন।”
শেভরনের ভূমিকা ও বাজার প্রতিক্রিয়া
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ভেনেজুয়েলার তেল সরবরাহ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছে মার্কিন কোম্পানি শেভরন। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিদিন প্রায় ১ থেকে দেড় লাখ ব্যারেল তেল যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করছে এবং সাম্প্রতিক অবরোধের মধ্যেও কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
ট্রাম্পের ঘোষণার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম ১.৫ শতাংশের বেশি কমে যায়, কারণ বাজারে ভেনেজুয়েলার তেলের সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
অর্থ কোথায় যাবে, অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে
ভেনেজুয়েলা এই তেল বিক্রির অর্থ সরাসরি পাবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। নিষেধাজ্ঞার কারণে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ (PDVSA) আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে, তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং ডলারে লেনদেন বন্ধ।
বর্তমানে ভেনেজুয়েলা তাদের প্রধান তেল গ্রেড ‘মেরেই’ ব্রেন্টের তুলনায় প্রায় ২২ ডলার কম দামে বিক্রি করছে, ফলে এই চুক্তির আর্থিক মূল্য সর্বোচ্চ ১৯০ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
ভবিষ্যৎ আলোচনা ও সম্ভাবনা
দুই দেশ সম্ভাব্য নিলামের মাধ্যমে মার্কিন ক্রেতাদের কাছে তেল বিক্রি, নতুন লাইসেন্স ইস্যু এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভে ভেনেজুয়েলার তেল ব্যবহারের বিষয়েও আলোচনা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ডাগ বার্গাম বলেন,
“ভেনেজুয়েলার ভারী তেলের প্রবাহ বাড়লে এটি যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান, জ্বালানির দাম এবং ভেনেজুয়েলা—সব পক্ষের জন্যই দারুণ খবর হবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি কার্যকর হলে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ভেনেজুয়েলা সম্পর্ক নতুন মোড় নিতে পারে।