নোবেল শান্তি নয়, বাস্তব শান্তি: ভেনিজুয়েলা ও ট্রাম্পের কঠোর বাস্তববাদ
শান্তি কি শুধু পুরস্কার আর ভাষণে সীমাবদ্ধ, নাকি কখনো কখনো কঠিন সিদ্ধান্তই প্রকৃত শান্তির পথ তৈরি করে? ভেনিজুয়েলার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই প্রশ্নকে আবার সামনে এনেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতির আলোকে এই সংকট নতুনভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
নোবেল শান্তি নয়, বাস্তব শান্তি: ভেনিজুয়েলা ও ট্রাম্পের কঠোর বাস্তববাদ
আশিকুর রহমান: ভেনিজুয়েলার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংকট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ০৩ জানুয়ারি ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কর্তৃক আটক করা হয়েছে—এমন খবরে কেউ কেউ একে “হস্তক্ষেপ” বললেও, বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। এটি ছিল একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রকে অপরাধচক্র, স্বৈরতন্ত্র ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা হুমকি থেকে মুক্ত করার একটি কঠোর কিন্তু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলে এসেছেন—গণতন্ত্র শুধু ভোটের বাক্সে সীমাবদ্ধ নয়, গণতন্ত্র মানে জনগণের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহি। মাদুরো সরকারের অধীনে ভেনিজুয়েলা বহু বছর ধরে এই তিনটির কোনোটিই নিশ্চিত করতে পারেনি। বরং দেশটি পরিণত হয়েছিল মাদক পাচার, সশস্ত্র মিলিশিয়া ও বিদেশি শক্তির প্রভাবকেন্দ্রে।
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে “নিরাপদ ট্রানজিশন”-এর কথা বলা হয়েছে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বার্থেই। ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিতে, এটি কোনো দখলদারিত্ব নয়; বরং একটি ব্যর্থ ও স্বৈরশাসিত রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক অপরাধের কেন্দ্র হয়ে উঠতে না দেওয়ার দায়িত্বশীল উদ্যোগ। আন্তর্জাতিক আইন কেবল কাগজে-কলমে নয়, বাস্তব নিরাপত্তার সাথেও সম্পর্কিত—এটাই ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন।
২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে এডমুন্ডো গনজালেজের পক্ষে জনসমর্থনের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা পশ্চিমা পর্যবেক্ষক ও ভেনিজুয়েলার বিরোধী শক্তির কাছেও স্পষ্ট। ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বাস করে—যেখানে জনগণের ভোট চুরি হয়, সেখানে নিরপেক্ষ ট্রানজিশনের জন্য আন্তর্জাতিক ভূমিকা অনিবার্য হয়ে পড়ে। গনজালেজকে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব হিসেবে বিবেচনা করা মানে ভেনিজুয়েলার জনগণের কণ্ঠকে স্বীকৃতি দেওয়া।
কারাকাসের প্লাজা ফ্রান্সিয়া ও আল্টামিরার মতো এলাকাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই স্বৈরতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক। এই রাজনৈতিক বাস্তবতা উপেক্ষা করে মাদুরো সরকার টিকে ছিল শুধুমাত্র শক্তি ও দমননীতির মাধ্যমে। এখান থেকেই উঠে এসেছেন মারিয়া কোরিনা মাচাদো—যিনি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন।
২০২৫ সালে তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে বিতর্কিত হলেও, ট্রাম্পপন্থীদের দৃষ্টিতে এটি ছিল ভেনিজুয়েলার জনগণের দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থনের একটি বার্তা। শান্তি মানে নিষ্ক্রিয়তা নয়; কখনো কখনো শান্তির জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়—এই বাস্তববাদী ধারণাটিই ট্রাম্প রাজনীতিতে বারবার তুলে ধরেছেন।
সমালোচকেরা যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী তকমা লাগাতে চান। কিন্তু প্রশ্ন হলো—একটি রাষ্ট্র যদি নিজ জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন বিশ্ব কি নীরব দর্শক হয়ে থাকবে? ট্রাম্পের উত্তর স্পষ্ট: না।
এই প্রেক্ষাপটে ভেনিজুয়েলার ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়ে দেয়—আদর্শিক শান্তির বুলি নয়, বাস্তব নিরাপত্তা ও গণতন্ত্র রক্ষাই ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দু। শান্তির নামে অশান্তিকে প্রশ্রয় দেওয়া নয়, বরং অশান্তির মূলকে কঠোর হাতে দমন করাই দীর্ঘমেয়াদি শান্তির একমাত্র পথ।