মাদকবিরোধী লড়াইয়ের টাকা দিয়ে পুলিশের বিলাসী গাড়ি কিনল নিউজার্সির শহর

ওয়াশিংটন টাউনশিপ এক লাখ সত্তর হাজার ডলার মাদক পুনর্বাসনের পরিবর্তে নজরদারি ক্যামেরা ও এসইউভি কিনেছে

মাদকবিরোধী লড়াইয়ের টাকা দিয়ে পুলিশের বিলাসী গাড়ি কিনল নিউজার্সির শহর
মাদকবিরোধী লড়াইয়ের টাকা দিয়ে পুলিশের বিলাসী গাড়ি কিনল নিউজার্সির শহর

যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সি অঙ্গরাজ্যের একটি ছোট শহরে এক চাঞ্চল্যকর কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়েছে যা পুরো দেশে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ওয়াশিংটন টাউনশিপ নামের এই শহরটি একসময় ভয়াবহ মাদক সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। ওপিওয়েড নামের একটি শক্তিশালী ব্যথানাশক ওষুধের নেশায় বহু মানুষ আসক্ত হয়ে পড়েছিল, অনেক পরিবার ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, অনেক তরুণ প্রাণ হারিয়েছিল। এই সংকটের জন্য বড় বড় ওষুধ কোম্পানিগুলোকে দায়ী করে হাজার হাজার মামলা হয়েছিল। আদালতের রায়ে ওষুধ কোম্পানিগুলো পঞ্চাশ বিলিয়ন ডলারের বেশি জরিমানা দিতে রাজি হয়। এই টাকা স্থানীয় সরকারগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছিল যাতে তারা মাদকাসক্তদের চিকিৎসা, স্কুলে সচেতনতা কার্যক্রম এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে।

কিন্তু ওয়াশিংটন টাউনশিপ সেই টাকা সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে ব্যয় করেছে। NJ.com-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানা গেছে, শহরটি দুই হাজার চব্বিশ এবং দুই হাজার পঁচিশ সালে এক লাখ সত্তর হাজার চারশ ছিয়াল্লিশ ডলার মাদকবিরোধী কর্মসূচির নামে দেখিয়েছে, কিন্তু বাস্তবে সেই টাকা দিয়ে পনেরোটি ফ্লক নজরদারি ক্যামেরা এবং দুটি দুই হাজার চব্বিশ সালের শেভ্রোলেট টাহো এসইউভি পুলিশের গাড়ি কিনেছে। এই গাড়িগুলোর প্রতিটির দাম প্রায় ষাট হাজার ডলার। এছাড়া ফ্লক ক্যামেরাগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং এগুলো মূলত গাড়ির নম্বর প্লেট শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়।

এই খবর প্রকাশের পর স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। দ্য কলেজ অফ নিউজার্সির মাদকাসক্তি বিশেষজ্ঞ স্যান্ডি গিবসন বলেছেন, এটি একেবারেই জঘন্য কাজ। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, রাজ্য সরকার কেন এই টাকার হিসাব নিরীক্ষা করছে না। তিনি বলেন, এই টাকা ছিল সেই সব পরিবারের জন্য যারা তাদের সন্তান হারিয়েছে, যারা এখনও মাদকের সাথে লড়াই করছে। সেই টাকা দিয়ে পুলিশের বিলাসী গাড়ি কেনা একেবারেই অনৈতিক।

শহরের রেকর্ড ঘেঁটে দেখা গেছে, তারা স্কুলে মাদক প্রতিরোধে কোনো টাকাই খরচ করেনি, যদিও সেটিই ছিল এই তহবিলের প্রধান উদ্দেশ্য। শহরের বর্তমান আইনজীবী ম্যাথিউ থমাস রুনি বলেছেন, এই কেনাকাটা আগের প্রশাসনের সময় করা হয়েছিল। বর্তমান প্রশাসন স্বচ্ছতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তারা মাদক সংকট মোকাবেলায় সর্বোত্তম উপায় খুঁজে বের করতে রাজ্যের সাথে কাজ করবে।

তবে ওয়াশিংটন টাউনশিপ একা নয়। NJ.com-এর তদন্তে দেখা গেছে, নিউজার্সির আরও বহু শহর এই তহবিলের অন্তত তেইশ লাখ ডলার কনসার্ট, ব্র্যান্ডের পোশাক, এমনকি একটি মাসল কার কেনার মতো বিলাসী খাতে খরচ করেছে। রাস্তা মেরামত, লাইটিং এবং পৌরসভার অন্যান্য সরঞ্জাম কেনার জন্যও এই টাকা ব্যবহার করা হয়েছে। দুই হাজার বাইশ সাল থেকে এই টাকা আসতে শুরু করে, কিন্তু অনেক শহরই এর সঠিক ব্যবহার করেনি।

এই ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রে একটি বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেকে বলছেন, স্থানীয় সরকারগুলোর ওপর আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। ফেডারেল সরকারের উচিত প্রতিটি ডলারের হিসাব নেওয়া। কারণ এই টাকা এসেছে হাজার হাজার মানুষের কষ্ট এবং মৃত্যুর বিনিময়ে। ওপিওয়েড সংকটে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর প্রায় আশি হাজার মানুষ মারা যায়। এই টাকা তাদের পরিবারকে সাহায্য করার জন্য ছিল।

এদিকে, নিউজার্সির অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস জানিয়েছে, তারা এই বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে। যদি কোনো শহর ইচ্ছাকৃতভাবে টাকার অপব্যবহার করে থাকে, তবে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্থানীয় বাসিন্দারা এখন টাউন হলের সামনে বিক্ষোভ করছেন এবং টাকার হিসাব চাইছেন।

এই খবরটি আমাদের জন্য একটি শিক্ষা। সরকারি তহবিলের সঠিক ব্যবহার কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে। মাদকের মতো ভয়াবহ সমস্যা মোকাবেলায় টাকা সঠিক জায়গায় ব্যবহার না হলে সংকট আরও বাড়বে। আশা করা যায়, এই কেলেঙ্কারির পর রাজ্য সরকার আরও কঠোর হবে এবং ভবিষ্যতে এই টাকা সত্যিকারের মাদক পুনর্বাসন এবং শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যবহার করা হবে।

ট্যাগ: নিউজার্সিমাদককেলেঙ্কারিযুক্তরাষ্ট্রদুর্নীতি

প্রতিবেদক

Tasmin Sultana

Sub- Reporter

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…