যুক্তরাষ্ট্রের বনাম আন্তর্জাতিক আদালত: সার্বভৌমত্বের দাবি কতটা সঠিক, আইনের জটিল বাস্তবতা উন্মোচন
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যুক্তরাষ্ট্রের সদস্যপদ নেই, তবে আদালতের এখতিয়ার নিয়ে আইনি বিতর্ক রয়েছে; ট্রাম্পের নতুন নিষেধাজ্ঞায় উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
৫২৫ বার পড়া হয়েছে ৬ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মধ্যে বিরোধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। ২০২৬ সালের ৯ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন আদালতটির প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর আগে আদালতের বিচারক ও কৌঁসুলিদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। আদালত এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের বক্তব্য হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি ছাড়া দেশটির নাগরিক ও কর্মকর্তাদের ওপর এই আদালতের কর্তৃত্ব প্রয়োগ করা গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি এখন শুধু কূটনৈতিক বিরোধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক আইনের সীমা, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং গুরুতর অপরাধের বিচারের প্রশ্ন।
ঘটনাটির পেছনের ইতিহাস বুঝতে হলে ১৯৯৮ সালে ফিরে যেতে হবে। ওই বছর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত প্রতিষ্ঠার জন্য রোম সংবিধি গৃহীত হয়। আদালতটি ২০০২ সালের ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে। এর মূল লক্ষ্য হলো গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং আগ্রাসনের অপরাধের মতো গুরুতর অপরাধের জন্য ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা। আদালতটি নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে অবস্থিত। এটি জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচার আদালত থেকে আলাদা একটি প্রতিষ্ঠান; দুটি আদালতের কাজ ও এখতিয়ার এক নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সদস্যপদ নিয়ে প্রচলিত বক্তব্যটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সত্য। যুক্তরাষ্ট্র ২০০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর রোম সংবিধিতে স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু দেশটি কখনো এই চুক্তি অনুমোদন করেনি এবং আদালতের সদস্যরাষ্ট্রে পরিণত হয়নি। ২০০২ সালের ৬ মে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন জাতিসংঘকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিটির পক্ষভুক্ত হতে চায় না এবং আগের স্বাক্ষর থেকে কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা গ্রহণ করছে না। সুতরাং, যুক্তরাষ্ট্র ২০০২ সালে আদালতের সদস্যপদ থেকে বেরিয়ে যায়—এভাবে বলা পুরোপুরি সঠিক নয়। সঠিক বক্তব্য হলো, দেশটি আগে স্বাক্ষর করলেও পরে জানিয়ে দেয় যে তারা চুক্তির পক্ষ হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও নিজস্ব বিচারব্যবস্থা রক্ষার যুক্তি। মার্কিন আইনপ্রণেতারা ২০০২ সালে মার্কিন সেনাসদস্যদের সুরক্ষা-সংক্রান্ত আইন পাস করেন। ওই আইনে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সঙ্গে সহযোগিতার ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মার্কিন নাগরিক ও মিত্রদের সুরক্ষায় প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার কথাও উল্লেখ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের আশঙ্কা, দেশের অনুমতি ছাড়া আন্তর্জাতিক আদালত মার্কিন সেনা, সরকারি কর্মকর্তা কিংবা অন্য নাগরিকদের বিরুদ্ধে মামলা চালালে তা দেশের সাংবিধানিক কর্তৃত্ব ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সংঘাত তৈরি করতে পারে।
তবে এখানেই মূল আইনি জটিলতা। যুক্তরাষ্ট্র আদালতের সদস্য নয়—এটি সত্য। কিন্তু সেখান থেকে সরাসরি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে, পৃথিবীর কোনো পরিস্থিতিতেই আদালত মার্কিন নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা চালাতে পারবে না। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের এখতিয়ার নির্ধারিত হয় রোম সংবিধির বিধান অনুযায়ী। সাধারণভাবে, কোনো সদস্যরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে সংঘটিত অপরাধের অভিযোগ থাকলে অভিযুক্ত ব্যক্তি অন্য দেশের নাগরিক হলেও আদালত সেই ঘটনার তদন্ত করতে পারে। একইভাবে, সদস্যরাষ্ট্রের নাগরিকের বিরুদ্ধে বিদেশে সংঘটিত নির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগও আদালতের এখতিয়ারে আসতে পারে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে কোনো পরিস্থিতি আদালতে পাঠানো হলেও এখতিয়ারের প্রশ্ন উঠতে পারে।
অর্থাৎ, কোনো দেশের সদস্য না হওয়া এবং সেই দেশের নাগরিকের বিরুদ্ধে আদালতের কোনো এখতিয়ারই না থাকা—দুটি এক বিষয় নয়। আদালতের নিজস্ব যুক্তি হলো, অপরাধ কোথায় সংঘটিত হয়েছে, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের সদস্যপদ কী, কোনো রাষ্ট্র বিশেষভাবে এখতিয়ার মেনে নিয়েছে কি না এবং নিরাপত্তা পরিষদের কোনো সিদ্ধান্ত রয়েছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনা করেই এখতিয়ার নির্ধারণ করতে হবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এই ব্যাখ্যার অনেক ক্ষেত্রেই বিরোধিতা করে এবং মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে আদালতের এখতিয়ারকে প্রত্যাখ্যান করে। ফলে বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে নিষ্পত্তি করা যায় না; নির্দিষ্ট ঘটনার আইনগত ভিত্তি আলাদাভাবে পরীক্ষা করতে হয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই বিরোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প প্রশাসন একটি নির্বাহী আদেশ জারি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নির্দিষ্ট কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দেয়। এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং ইসরায়েলসহ মিত্রদেশের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আদালতের তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তির কথা তুলে ধরা হয়। আদালতের প্রেসিডেন্ট ওই পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন, নিষেধাজ্ঞা আদালতের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য ছিল, অনুমতি ছাড়া মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া জাতীয় সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী।
বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও আইনি বিরোধ তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে একজন মার্কিন ফেডারেল বিচারক ট্রাম্প প্রশাসনের ওই নির্বাহী আদেশ কার্যকরের ওপর বাধা দেন। মামলাটিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নিষেধাজ্ঞার ব্যাপকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিচারকের পর্যবেক্ষণ ছিল, আদেশটি আদালতের কৌঁসুলিকে সহায়তা করে—এমন বক্তব্যভিত্তিক সেবার ওপরও অতিরিক্ত বিস্তৃত বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, এমনকি সেই সহায়তা মার্কিন নাগরিক বা ইসরায়েল-সংক্রান্ত তদন্তের সঙ্গে যুক্ত না হলেও। তবে ওই রায়কে আদালতের এখতিয়ার নিয়ে সব বিতর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন পদক্ষেপও নিয়েছে।
২০২৬ সালের ৯ অক্টোবরের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। আদালতের প্রকাশিত বিবৃতি এবং সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এবার শুধু নির্দিষ্ট কর্মকর্তা নয়, আদালত প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। আদালত জানিয়েছে, এই পদক্ষেপ তার কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধের শিকার মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আদালত সদস্যরাষ্ট্রগুলোর প্রতি প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সচল রাখতে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান হলো, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও মিত্রদের বিরুদ্ধে আদালতের পদক্ষেপের জবাব দেওয়া প্রয়োজন। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা ও মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে টানাপোড়েন আরও বাড়িয়েছে।
এই বিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত নিজে কোনো দেশের পুলিশ বা সেনাবাহিনীর মতো সর্বত্র গিয়ে গ্রেপ্তার করতে পারে না। আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাস্তবায়নের জন্য সাধারণত রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। তাই আদালত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করলেও সেটি কার্যকর করা এবং অভিযুক্তকে আদালতে হাজির করা আলাদা বিষয়। কোনো রাষ্ট্র সহযোগিতা না করলে আদালতের কাজ কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে সদস্যরাষ্ট্রগুলো তাদের চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব অনুযায়ী সহযোগিতা করবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ফলে আদালতের আইনি এখতিয়ার থাকা এবং সেই এখতিয়ার বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারা এক জিনিস নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান ও নিজস্ব আদালতের গুরুত্ব নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। দেশটি নিজস্ব আইন অনুযায়ী অপরাধের বিচার করে এবং আন্তর্জাতিক আদালতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তার আইনগত অবস্থান নির্ধারণ করে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার নিয়ে প্রশ্ন উঠলে শুধু জাতীয় আইন বা রাজনৈতিক অবস্থান উল্লেখ করলেই সব আন্তর্জাতিক আইনি বিতর্ক শেষ হয়ে যায় না। আবার আন্তর্জাতিক আদালতও নিজেকে সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে দাবি করতে পারে না; তার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত চুক্তি ও প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক আইনের বিধানের ওপর নির্ভরশীল। এই দুই নীতির মধ্যে ভারসাম্যই বর্তমান বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু।
সামগ্রিকভাবে, “যুক্তরাষ্ট্র কখনো আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্য হয়নি”—এই বক্তব্যটি যথার্থ। “২০০২ সালে সদস্যপদ থেকে বেরিয়ে এসেছে”—এটি সঠিক বর্ণনা নয়, কারণ যুক্তরাষ্ট্র কখনো সদস্যরাষ্ট্রই হয়নি; বরং স্বাক্ষরের পর চুক্তির পক্ষ না হওয়ার কথা জানায়। আর “আদালতের যুক্তরাষ্ট্রে কোনো কর্তৃত্ব নেই”—এ বক্তব্যটি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি অবস্থানকে তুলে ধরে, কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের সব সম্ভাব্য পরিস্থিতির পূর্ণ ব্যাখ্যা নয়। নির্দিষ্ট মামলায় আদালতের এখতিয়ার আছে কি না, তা নির্ভর করে অভিযোগের ধরন, অপরাধ সংঘটনের স্থান, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের অবস্থান এবং প্রযোজ্য আইনি বিধানের ওপর। তাই ঘটনাটি বোঝার জন্য রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি চুক্তির প্রকৃত ভাষা ও আদালতের এখতিয়ারসংক্রান্ত নিয়মও বিবেচনা করা জরুরি।




