ট্রাম্পের বার্তা, বিক্ষোভকারীরা ভেঙেছিল কলম্বাসের মূর্তি, ছয় বছর পর ফিরল হোয়াইট হাউস
বাল্টিমোরে বিক্ষোভকারীদের ভাঙা কলম্বাসের ভাস্কর্য উদ্ধার করে পুনর্নির্মাণ, এবার হোয়াইট হাউসে স্থাপন করে ইতালীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দিচ্ছেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের বার্তা, বিক্ষোভকারীরা ভেঙেছিল কলম্বাসের মূর্তি, ছয় বছর পর ফিরল হোয়াইট হাউস
৯০৪ বার পড়া হয়েছে৩৪ শেয়ার ৬ মিনিটে পড়ুন
২০২০ সালের ৪ জুলাই রাতে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের বাল্টিমোরে বিক্ষোভকারীরা ক্রিস্টোফার কলম্বাসের একটি মার্বেল পাথরের ভাস্কর্য দড়ি দিয়ে টেনে নামিয়ে ভেঙে ফেলেন। পরে ভাস্কর্যের ভাঙা অংশগুলো শহরের অভ্যন্তরীণ বন্দরের পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। ছয় বছর পর সেই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত পুনর্নির্মিত ভাস্কর্য হোয়াইট হাউসের পাশে স্থাপন করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ঘটনাটি আবারও সামনে এনেছে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস, বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলন এবং ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ নিয়ে চলমান বিতর্ক।
২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলম্বাস দিবস সামনে রেখে ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনের উদ্যোগে কলম্বাসের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং ইতালীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি আবারও সামনে এনেছেন। এর পেছনে রয়েছে ছয় বছর আগের একটি ঘটনা, যা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে আলোচিত হয়ে আছে।
২০২০ সালের ওই রাতে বাল্টিমোরের লিটল ইতালি এলাকায় বিক্ষোভকারীরা ভাস্কর্যটির চারপাশে দড়ি বেঁধে টান দেন। ভাস্কর্যটি মাটিতে পড়ে কয়েকটি অংশে ভেঙে যায়। এরপর তাঁরা ভাঙা অংশগুলো টেনে নিয়ে বন্দরের পানিতে ফেলে দেন। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বর্ণবৈষম্য ও পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর প্রতিবাদে ব্যাপক আন্দোলন চলছিল। বিভিন্ন শহরে দাসপ্রথা, উপনিবেশবাদ ও আদিবাসীদের ওপর নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত বলে বিবেচিত ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের ভাস্কর্য অপসারণের দাবিও জোরালো হয়েছিল। কলম্বাসের ভাস্কর্যটি ১৯৮৪ সালে স্থাপন করা হয়েছিল। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের উপস্থিতিতে এর উদ্বোধন হয়। ইতালীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের কাছে এটি ছিল তাঁদের ঐতিহ্য, অভিবাসী পরিচয় ও সাংস্কৃতিক গর্বের প্রতীক। অন্যদিকে, অনেক আদিবাসী অধিকারকর্মীর কাছে কলম্বাসের নাম ইউরোপীয় উপনিবেশ বিস্তার, দাসত্ব, সহিংসতা এবং আদিবাসীদের ওপর নিপীড়নের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। এই দুই বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গিই ভাস্কর্যটি নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল।
বিক্ষোভকারীরা ভাস্কর্যটি পানিতে ফেলে দেওয়ার পর অনেকেই মনে করেছিলেন, স্মৃতিচিহ্নটি আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। কিন্তু ঘটনাটি সেখানে শেষ হয়নি। পরদিন লিটল ইতালি এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা দড়ি ব্যবহার করে ভাস্কর্যটি উদ্ধার করার চেষ্টা করেন। তাঁদের প্রথম চেষ্টা সফল হয়নি। পরে পেশাদার উদ্ধারকারী দল, ডুবুরি এবং ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে ভাঙা অংশগুলো পানি থেকে তুলে আনা হয়। ২০২০ সালের ৬ জুলাই উদ্ধারকাজ সম্পন্ন করার সময় ক্রেন ও ডুবুরি ব্যবহার করা হয়। খণ্ডাংশগুলো পানি থেকে তোলার কাজে ভারী মালামাল উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান ডিগিং অ্যান্ড রিগিংয়ের কর্মীরাও সহায়তা করেন। উদ্ধারকাজের পর ভাস্কর্যের অংশগুলো নিরাপদ স্থানে রাখা হয়। ইতালীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলো তখনই ভাস্কর্যটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানায়। এই উদ্ধার অভিযান কেবল একটি ভাঙা ভাস্কর্য তুলে আনার প্রচেষ্টা ছিল না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল একটি সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার প্রশ্ন। ইতালীয় বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও সংগঠকেরা ভাস্কর্যটির অংশ উদ্ধার, সংরক্ষণ এবং পুনর্নির্মাণের কাজে যুক্ত হন। তাঁদের কাছে এটি ছিল এমন একটি প্রতীক, যেটি ভেঙে ফেলা হলেও ঐতিহ্যের স্মৃতি মুছে যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ভাস্কর্যটি পুনর্গঠনের পেছনে অর্থ সংগ্রহ এবং কারিগরি কাজের জন্য উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা চালানো হয়। ভাঙা অংশগুলো সংরক্ষণ করে পুনর্নির্মাণের জন্য শিল্পী উইল হেমসলির সঙ্গে কাজ করা হয়। মূল ভাস্কর্যের অবশিষ্টাংশের ত্রিমাত্রিক নকশা তৈরি করে সেগুলোকে নতুন কাঠামোর সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া হয়। পুনর্নির্মিত ভাস্কর্যটি মূল পাথরের খণ্ডাংশের পাশাপাশি চূর্ণ মার্বেল ও রজনের মিশ্রণ ব্যবহার করে তৈরি করা হয়।
২০২২ সালে পুনর্নির্মাণের কাজ শেষ হয়। এর ফলে মূল ভাস্কর্যটির ঐতিহাসিক অংশগুলো সংরক্ষণ করে নতুন একটি ভাস্কর্য তৈরি করা সম্ভব হয়। পরে সেটি কোথায় স্থাপন করা হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় ইতালীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান সংগঠনগুলোর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা ভাস্কর্যটির মালিকানা ধরে রেখে এর ভবিষ্যৎ ব্যবহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়, ট্রাম্প প্রশাসন পুনর্নির্মিত ভাস্কর্যটি হোয়াইট হাউসের কাছে স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। মার্চ মাসে সেটি হোয়াইট হাউস চত্বরের পাশে আইজেনহাওয়ার নির্বাহী কার্যালয় ভবনের বাইরে স্থাপন করা হয়। ফলে ২০২০ সালে বাল্টিমোরের বন্দরে ফেলে দেওয়া মূল ভাস্কর্যের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত একটি পুনর্নির্মিত স্মৃতিচিহ্ন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক এলাকার অংশ হয়ে ওঠে। ভাস্কর্যটির ভিত্তিতে এর ধ্বংস ও পুনর্গঠনের ইতিহাস উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ২০২০ সালের ৪ জুলাই ধ্বংস এবং ২০২২ সালে পুনরুত্থানের কথা লেখা রয়েছে। হোয়াইট হাউসের কাছে স্থাপন করা এই ভাস্কর্যটি ট্রাম্প প্রশাসনের ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের অবস্থানকে দৃশ্যমান করেছে। একই সঙ্গে এটি আবারও প্রশ্ন তুলেছে, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে সম্মান জানানো হবে এবং কারা সেই সিদ্ধান্ত নেবে।
ট্রাম্পের কাছে কলম্বাসের স্মৃতি সংরক্ষণের বিষয়টি রাজনৈতিক গুরুত্বও বহন করে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কলম্বাস দিবস উদ্যাপন এবং কলম্বাসের স্মৃতিচিহ্ন রক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর সমর্থকদের একটি অংশ মনে করেন, কলম্বাসকে সম্মান জানানো ইতালীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের ঐতিহ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের একটি অংশকে স্বীকৃতি দেওয়ার সমতুল্য। তাঁদের দৃষ্টিতে, বিক্ষোভের সময় ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা ছিল ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের ওপর আঘাত। তবে এই দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে রয়েছে আদিবাসী অধিকারকর্মী ও ইতিহাসবিদদের আপত্তি। তাঁদের মতে, কলম্বাসকে কেবল নতুন ভূখণ্ডে ইউরোপীয়দের আগমনের প্রতীক হিসেবে দেখলে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়। তাঁর অভিযানের পর আমেরিকার আদিবাসীদের ওপর উপনিবেশ স্থাপন, শোষণ, দাসত্ব এবং সহিংসতার যে দীর্ঘ ইতিহাস গড়ে ওঠে, সেটিও আলোচনায় রাখা জরুরি। তাই তাঁদের কাছে কলম্বাসের ভাস্কর্যকে প্রকাশ্যে সম্মান জানানো নিছক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিষয় নয়; এটি ইতিহাসকে কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, সেই প্রশ্নের সঙ্গেও জড়িত। যুক্তরাষ্ট্রে এই বিতর্কের আরেকটি দিক হলো কলম্বাস দিবসের পরিবর্তে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার আন্দোলন। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় প্রশাসন ইতিমধ্যে বিকল্পভাবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দিবস পালন করছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০২১ সালে প্রথম দায়িত্ব পালনরত মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দিবস ঘোষণা করেন। ফলে কলম্বাসের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ নিয়ে ট্রাম্পের উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস ও পরিচয় নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। বাল্টিমোরে উদ্ধার করা মূল ভাস্কর্যের অংশগুলো থেকে নতুন ভাস্কর্য তৈরি করা হলেও হোয়াইট হাউসের সামনে স্থাপন করা ভাস্কর্যটিকে মূল অক্ষত ভাস্কর্য বলা সঠিক নয়। এটি মূল ভাস্কর্যের অবশিষ্টাংশ ব্যবহার করে তৈরি করা পুনর্নির্মিত প্রতিরূপ। এই পার্থক্যটি প্রতিবেদনে স্পষ্ট রাখা জরুরি, যাতে পাঠকের কাছে ঘটনার প্রকৃত ইতিহাস সঠিকভাবে পৌঁছায়।
২০২৬ সালের অক্টোবরের ঘটনাপ্রবাহে ট্রাম্পের বক্তব্যের তাৎপর্যও এখানেই। ২০২০ সালে বিক্ষোভকারীরা ভাস্কর্যটি ধ্বংস করে মনে করেছিলেন যে তাঁরা তাঁদের দাবি প্রতিষ্ঠা করেছেন, এমন রাজনৈতিক বার্তাই তিনি তুলে ধরছেন। কিন্তু উদ্ধার, পুনর্নির্মাণ এবং শেষ পর্যন্ত হোয়াইট হাউসের পাশে স্থাপনের ঘটনাকে তিনি সেই প্রতিবাদের বিপরীতে একটি প্রতীকী জবাব হিসেবে উপস্থাপন করছেন। তাঁর সমর্থকদের কাছে এটি ঐতিহ্য রক্ষার বিজয়; সমালোচকদের কাছে এটি বিতর্কিত ইতিহাসকে সরকারি মর্যাদা দেওয়ার উদাহরণ। সব মিলিয়ে, বাল্টিমোরের বন্দরে ভেঙে পড়া ভাস্কর্যের কাহিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস নিয়ে চলমান মতবিরোধের প্রতীক। একদিকে রয়েছে ইতালীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের সাংস্কৃতিক গর্ব এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রচেষ্টা। অন্যদিকে রয়েছে আদিবাসীদের ইতিহাস, উপনিবেশবাদ ও সহিংসতার স্মৃতি উপেক্ষা না করার দাবি। ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগ এই দুই অবস্থানের মধ্যে বিতর্ককে আরও সামনে এনেছে।