ট্রাম্পের সঙ্গে বিমানে যেতে পারল না পলিটিকোর সাংবাদিক

নেব্রাস্কা সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে বিমানযাত্রা থেকে পলিটিকোকে বাদ দিল হোয়াইট হাউস, আদালতের নির্দেশের পরও বাড়ল সংবাদমাধ্যম নিয়ে নতুন সংঘাত।

ট্রাম্পের সঙ্গে বিমানে যেতে পারল না পলিটিকোর সাংবাদিক

ট্রাম্পের সঙ্গে বিমানে যেতে পারল না পলিটিকোর সাংবাদিক


যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেব্রাস্কা সফরকে ঘিরে হোয়াইট হাউস ও সংবাদমাধ্যমের মধ্যে চলমান বিরোধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। সোমবার, ৫ অক্টোবর, ট্রাম্পের সঙ্গে নেব্রাস্কার গ্র্যান্ড আইল্যান্ডে যাওয়ার জন্য নির্ধারিত সরকারি বিমানে উঠতে দেওয়া হয়নি পলিটিকোর সাংবাদিকদের। বিষয়টি পলিটিকোর একজন মুখপাত্রও নিশ্চিত করেছেন। 


ঘটনাটি এমন সময় ঘটল, যখন পলিটিকো, সিএনএন এবং এমএস নাওকে হোয়াইট হাউসের কার্যক্রম থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা চলছে। কয়েক সপ্তাহ আগে ওই তিন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসের প্রবেশাধিকার বাতিল করেছিল প্রশাসন। পরে ফেডারেল বিচারক টিমোথি কেলি তাদের সংবাদ সংগ্রহের অনুমতি ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। 


তবে হোয়াইট হাউসের অবস্থান হলো, আদালতের নির্দেশ মূলত হোয়াইট হাউস প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নিয়ে। তাদের দাবি, প্রেসিডেন্টের সরকারি বিমানে ভ্রমণ বা ওভাল অফিসের মতো সীমিত আসনের জায়গায় প্রবেশের বিষয়টি আলাদা। প্রশাসনের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চেউং এর আগে এমন অবস্থানই প্রকাশ করেছিলেন। 


পলিটিকোর ক্ষেত্রে সোমবারের ঘটনাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ওই দিন প্রেসিডেন্টের বাইরে সফরের সংবাদমাধ্যমের দলে পলিটিকোর নির্ধারিত দায়িত্ব ছিল। এই দলের সাংবাদিকরা প্রেসিডেন্ট কোথায় যাচ্ছেন, কখন পৌঁছাচ্ছেন এবং সফরের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করে অন্য সংবাদমাধ্যমের কাছেও তথ্য সরবরাহ করেন। পলিটিকোকে বাদ দেওয়ার ফলে সেই নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হয়নি। 


প্রতিবেদন অনুযায়ী, হোয়াইট হাউস পরে পলিটিকোর জন্য নির্ধারিত আসন অন্য সংবাদমাধ্যমকে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু কয়েকটি সংবাদমাধ্যম সেই দায়িত্ব নিতে রাজি হয়নি। ফলে প্রেসিডেন্টের সফরের সংবাদমাধ্যমের দল নিয়ে শেষ মুহূর্তে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়। 


এখানেই বিষয়টি শুধু একটি সংবাদমাধ্যমকে বিমানে উঠতে না দেওয়ার ঘটনা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাংবাদিকদের নিয়মিত যোগাযোগ এবং সরকারি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের অধিকার নিয়ে বড় সাংবিধানিক প্রশ্ন।


গত ১৮ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প প্রশাসন পলিটিকো, সিএনএন এবং এমএস নাওকে হোয়াইট হাউস থেকে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেয়। ওই তিন সংবাদমাধ্যম পরে আদালতে মামলা করে। তাদের অভিযোগ ছিল, প্রশাসনের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। 


ফেডারেল বিচারক টিমোথি কেলি পরে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সাময়িক নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশের ফলে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো আবার হোয়াইট হাউস প্রাঙ্গণে প্রবেশের সুযোগ পায়। কিন্তু আদালতের নির্দেশে প্রেসিডেন্টের বিমানে ভ্রমণের বিষয়টি সরাসরি উল্লেখ না থাকায় প্রশাসন সেই পার্থক্যকে ভিত্তি করে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে বলে সংবাদমাধ্যমগুলো অভিযোগ করছে। 


এর আগে সিএনএনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ভ্রমণকারী সংবাদমাধ্যমের দলে সিএনএনের পালা থাকা সত্ত্বেও তাদের সাংবাদিকদের বিমানে উঠতে দেওয়া হয়নি। পলিটিকোর ক্ষেত্রে এবার সেই একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হলো। ফলে বিরোধটি এখন একাধিক সংবাদমাধ্যমকে ঘিরে আরও বিস্তৃত হয়েছে। 


হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, প্রেসিডেন্টের সরকারি বিমানে আসন সীমিত এবং সেখানে ভ্রমণ করা সাংবাদিকদের জন্য স্বয়ংক্রিয় অধিকার নয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিমানে ভ্রমণ একটি বিশেষ সুবিধা এবং প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা ও কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত সীমিত পরিসরের ব্যবস্থা। 


অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমগুলোর আইনজীবীরা বলছেন, নির্বাচিত বা পছন্দের সংবাদমাধ্যমকে সুবিধা দিয়ে অন্য সংবাদমাধ্যমকে তাদের সংবাদ পরিবেশনের কারণে বাদ দেওয়া হলে তা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। পলিটিকো, সিএনএন এবং এমএস নাওয়ের পক্ষ থেকে আদালতের কাছে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা চাওয়া হয়েছে। 


এই আইনি লড়াইয়ের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর। ওই দিন বিচারক কেলি সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর করা দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা চাওয়ার আবেদনের বিষয়ে শুনানি করবেন। ফলে পলিটিকোকে নেব্রাস্কা সফরের বিমান থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনা আদালতের সামনে চলমান মামলায় নতুন প্রমাণ বা নতুন অভিযোগ হিসেবে আলোচনায় আসতে পারে। 


এদিকে ট্রাম্পের নেব্রাস্কা সফরও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি গ্র্যান্ড আইল্যান্ডে গিয়ে রিপাবলিকান সিনেটর পিট রিকেটসের পক্ষে প্রচারে অংশ নেন। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থন বাড়ানোর জন্য ট্রাম্প দেশটির বিভিন্ন রক্ষণশীল এলাকায় ধারাবাহিক সফর করছেন। 


নেব্রাস্কার এই সফরকে কেন্দ্র করে অর্থনীতি, জ্বালানি মূল্য, কৃষক ও পশুপালকদের সমস্যা এবং মাংস আমদানির নীতি নিয়েও রাজনৈতিক আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে বিদেশ থেকে গরুর মাংস আমদানির পরিকল্পনা নিয়ে নেব্রাস্কার কিছু কৃষক ও পশুপালকের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। ট্রাম্পের সফরের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল রিপাবলিকান সমর্থকদের উজ্জীবিত করা এবং পিট রিকেটসের নির্বাচনী প্রচারে সহায়তা করা। 


তবে সফরের রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমকে বিমান থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাটিই সোমবারের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে। কারণ প্রেসিডেন্টের সফরের সময় নির্ধারিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি না থাকলে অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের কাছে সরাসরি তথ্য পৌঁছানোর ব্যবস্থাও প্রভাবিত হতে পারে।


এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবি যে পলিটিকোকে বিমান থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেটি সঠিক। পলিটিকোর পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং একাধিক নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম একই তথ্য প্রকাশ করেছে। 

তবে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত “পলিটিকো এই আচরণ শতভাগ প্রাপ্য” ধরনের বক্তব্যকে সংবাদ হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। এটি একটি মতামত, তথ্য নয়। একইভাবে “সিএনএন ও পলিটিকোকে গাড়ি ভাগাভাগি করে যেতে হবে” ধরনের মন্তব্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্য; এর কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত বা বাস্তব পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক নেই।


আরেকটি বিষয়ও পরিষ্কার করা জরুরি। পলিটিকোকে হোয়াইট হাউসের সব ধরনের কার্যক্রম থেকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে—এমন দাবি এই মুহূর্তে সঠিক নয়। আদালতের সাময়িক নির্দেশের কারণে সংবাদমাধ্যমটির হোয়াইট হাউস প্রাঙ্গণে প্রবেশাধিকার পুনর্বহাল হয়েছে। বর্তমান বিরোধটি বিশেষ করে সীমিত আসনের অনুষ্ঠান এবং প্রেসিডেন্টের সরকারি বিমানে ভ্রমণের সুযোগ নিয়ে। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর