নিউ জার্সিতে জীবনযাত্রার খরচ ছয় বছরে লাফিয়ে বেড়েছে, পরিবারে বাড়ছে চাপ
নিউ জার্সিতে শিশু যত্ন, বাসস্থান ও চিকিৎসার খরচ দ্রুত বেড়েছে, ফলে অনেক পরিবারের মাসিক বাজেটে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।
নিউ জার্সিতে জীবনযাত্রার খরচ ছয় বছরে লাফিয়ে বেড়েছে, পরিবারে বাড়ছে চাপ
নিউ জার্সিতে বসবাসকারী পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার খরচ গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মহামারির সময়ের তুলনায় রাজ্যটিতে পরিবার পরিচালনার মোট খরচ প্রায় ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে শিশু যত্ন, বাসস্থান এবং চিকিৎসা ব্যয় সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি করছে।
এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ নিউ জার্সির বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় পরিবারগুলোর জন্য। কারণ নিউ জার্সিতে অনেক পরিবার একই সঙ্গে বাড়িভাড়া বা বাড়ির ঋণ, শিশুদের যত্ন, যাতায়াত, খাবার, চিকিৎসা এবং অন্যান্য দৈনন্দিন খরচ বহন করছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের তুলনায় নিউ জার্সিতে শিশু যত্নের খরচ প্রায় ৫৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে বাসস্থানের খরচ প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং চিকিৎসা ব্যয় প্রায় ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে।
পরিবারগুলোর জন্য শিশু যত্নের খরচ এখন সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি। যেসব পরিবারে স্বামী-স্ত্রী দুজনই কাজ করেন, তাদের ক্ষেত্রে ছোট শিশুদের দেখাশোনার জন্য আলাদা অর্থ ব্যয় করতে হয়। অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে এই খরচ মাসিক বাড়িভাড়া বা বাড়ির ঋণের কিস্তির কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে।
নিউ জার্সির একটি পরিবারের উদাহরণ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, তিন সন্তানের শিশু যত্নের জন্য তাদের মাসে প্রায় ৫ হাজার ডলার খরচ হচ্ছে। ওই পরিবারটি আগে নিউইয়র্ক শহরে বসবাস করত। পরে নিউ জার্সিতে চলে গেলেও শিশু যত্ন, যাতায়াত এবং বাড়ির ঋণের খরচ মিলিয়ে তারা প্রত্যাশিত সাশ্রয় করতে পারেনি।
একসময় নিউইয়র্ক শহরের তুলনায় নিউ জার্সিকে অনেক পরিবারের কাছে তুলনামূলক কম খরচের আবাসস্থল হিসেবে দেখা হতো। বিশেষ করে নিউইয়র্ক শহরে কাজ করা পরিবারগুলো শহরের বাইরে অপেক্ষাকৃত বড় বাসা এবং কিছুটা কম আবাসন ব্যয়ের আশায় নিউ জার্সিতে চলে যেত।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ব্যবধান অনেক ক্ষেত্রে কমে এসেছে। বাড়ির দাম, বাড়ির ঋণের সুদ, সম্পত্তি কর, শিশু যত্ন এবং চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নিউ জার্সিতে পরিবার পরিচালনার মোট খরচ অনেক বেড়েছে।
জার্সির সমস্যা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক বাজারেও পণ্যের দাম এখনো আগের বছরের তুলনায় বেশি। সর্বশেষ সরকারি ভোক্তা মূল্যসূচক অনুযায়ী, আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে সামগ্রিক ভোক্তা মূল্য এক বছরে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। খাদ্যের দাম বেড়েছে ২ দশমিক ৭ শতাংশ এবং বাসস্থানের খরচ বেড়েছে প্রায় ৩ শতাংশ।
জ্বালানি খরচও পরিবারের বাজেটে বড় ভূমিকা রাখছে। আগস্টে এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি খাতের দাম ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছিল। এর মধ্যে পেট্রোলের দাম বেড়েছে ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ। বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ এবং পাইপের মাধ্যমে সরবরাহ করা প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়েছে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ে গাড়ি ব্যবহারকারী পরিবারগুলোর ওপর। নিউ জার্সিতে অনেক মানুষ কাজের জন্য প্রতিদিন গাড়িতে দীর্ঘ পথ যাতায়াত করেন। ফলে পেট্রোলের দাম বাড়লে শুধু গাড়ি চালানোর খরচ নয়, কর্মস্থলে যাতায়াতের মোট ব্যয়ও বেড়ে যায়।
বাংলাদেশি পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। অনেক পরিবারে একই সঙ্গে সন্তানদের স্কুল, শিশু যত্ন, বয়স্ক বাবা-মায়ের চিকিৎসা এবং কর্মস্থলে যাতায়াতের খরচ থাকে। ফলে কোনো একটি খাতে সামান্য বৃদ্ধি হলেও মাস শেষে পরিবারের মোট ব্যয়ে বড় পার্থক্য তৈরি হতে পারে।
চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়টিও উদ্বেগের। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগস্টে হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসাসেবার মূল্য এক বছরে ৫ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। চিকিৎসকের সেবার মূল্যও বেড়েছে প্রায় ২ শতাংশ।
স্বাস্থ্যবীমা থাকা সত্ত্বেও অনেক পরিবারকে নিজের পকেট থেকে চিকিৎসার অর্থ দিতে হয়। বিশেষ করে বীমার মাসিক মূল্য, চিকিৎসার আগে নির্ধারিত নিজস্ব অর্থ প্রদান, ওষুধ এবং জরুরি চিকিৎসার খরচ মিলিয়ে পরিবারের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে নিউ জার্সিতে বাড়ি কেনার ক্ষেত্রেও চাপ রয়েছে। বাড়ির দাম বেশি থাকার পাশাপাশি বাড়ির ঋণের সুদও অনেক পরিবারের মাসিক কিস্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে অনেক মানুষ বাড়ি কেনার পরিকল্পনা পিছিয়ে দিয়ে ভাড়ার বাসায় থাকছেন।
এ অবস্থায় নিউ জার্সিতে বসবাসকারী পরিবারের জন্য মাসিক বাজেট আরও সতর্কভাবে পরিচালনা করা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু বাড়িভাড়া বা বাড়ির কিস্তি হিসাব করলেই হবে না। শিশু যত্ন, যাতায়াত, চিকিৎসা, খাবার, বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং কর—সবকিছুকে একসঙ্গে হিসাব করতে হবে।