মাইক্রোসফটসহ বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের গ্রিন কার্ড প্রক্রিয়া স্থগিত যুক্তরাষ্ট্রে

মাইক্রোসফটসহ আট বড় প্রতিষ্ঠানের বিদেশি কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের আবেদন প্রক্রিয়ায় নতুন বাধা, তবে বর্তমান কর্মভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হচ্ছে না।

মাইক্রোসফটসহ বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের গ্রিন কার্ড প্রক্রিয়া স্থগিত যুক্তরাষ্ট্রে

মাইক্রোসফটসহ বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের গ্রিন কার্ড প্রক্রিয়া স্থগিত যুক্তরাষ্ট্রে


যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি দক্ষ কর্মীদের স্থায়ীভাবে বসবাসের পথ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন মাইক্রোসফট, অ্যাডোবি এবং কয়েকটি বড় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য স্থায়ী বসবাসের আবেদনের গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপের কার্যক্রম স্থগিত করেছে। সরকারের অভিযোগ, কিছু প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মী নিয়োগের ব্যবস্থার অপব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের চাকরির সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবে এই সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সব বিদেশি কর্মীর বর্তমান কর্মভিসা বাতিল হয়ে গেছে।


৮ অক্টোবরের ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগ জানায়, মাইক্রোসফট, অ্যাডোবি, কগনিজ্যান্ট, ইনফোসিস, টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস, উইপ্রো, এইচসিএল টেকনোলজিস এবং ক্যাপজেমিনির ক্ষেত্রে স্থায়ী শ্রম সনদ কার্যক্রমের নতুন আবেদন গ্রহণ এবং আগের কিছু আবেদন প্রক্রিয়াকরণ বন্ধ করা হয়েছে। এই স্থায়ী শ্রম সনদ সাধারণত চাকরির মাধ্যমে বিদেশি কর্মীর স্থায়ী বসবাসের অনুমোদন পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।


এই ব্যবস্থার নাম স্থায়ী শ্রম সনদ প্রক্রিয়া। সহজ ভাষায়, কোনো মার্কিন প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মীকে চাকরির মাধ্যমে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ দিতে চাইলে অনেক ক্ষেত্রে আগে সরকারকে দেখাতে হয় যে ওই নির্দিষ্ট চাকরির জন্য যথেষ্ট যোগ্য ও প্রস্তুত মার্কিন কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না এবং বিদেশি কর্মী নিয়োগের ফলে একই ধরনের কাজে থাকা মার্কিন কর্মীদের বেতন ও কর্মপরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।


এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রক্রিয়াটি সরাসরি কোনো কর্মীর ব্যক্তিগত আবেদন দিয়ে শুরু হয় না। সাধারণত নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানই বিদেশি কর্মীর হয়ে এই প্রক্রিয়া শুরু করে। তাই কোনো কর্মী বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে কাজ করলেও তার প্রতিষ্ঠান এই প্রক্রিয়ায় বাধার মুখে পড়লে স্থায়ী বসবাসের পরিকল্পনা বিলম্বিত হতে পারে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মী নিয়োগের ব্যবস্থাকে এমনভাবে ব্যবহার করেছে, যাতে তুলনামূলক কম বেতনে বিদেশি কর্মী নিয়োগের সুযোগ তৈরি হয় এবং একই সময়ে মার্কিন কর্মীদের চাকরির সুযোগ কমে যায়। ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বিশেষ করে মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ তুলেছেন। তবে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে সব দাবির বিস্তারিত প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।

মাইক্রোসফট অবশ্য সরকারের অভিযোগের সঙ্গে ভিন্নমত জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, তাদের দেওয়া বিদেশি কর্মীসংক্রান্ত আবেদনের বড় অংশই নতুন কর্মী নিয়োগের জন্য নয়, বরং আগে থেকেই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মীদের অবস্থান পরিবর্তন বা মেয়াদ বাড়ানোর সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, একই ধরনের কাজ করা কর্মীদের ক্ষেত্রে বিদেশি কর্মীদের বেতন অন্য কর্মীদের তুলনায় কম দেওয়া হয় না।


নতুন সিদ্ধান্তের কারণে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ভারতীয় বংশোদ্ভূত তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবীদের বিষয়টি। কারণ ইনফোসিস, টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস, উইপ্রো এবং এইচসিএলসহ একাধিক ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রে বিপুলসংখ্যক দক্ষ কর্মী নিয়োগ করে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক কর্মী দীর্ঘমেয়াদি চাকরির মাধ্যমে স্থায়ী বসবাসের আবেদন করার পরিকল্পনা করেন। ফলে স্থায়ী শ্রম সনদ প্রক্রিয়ায় স্থগিতাদেশ তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।


তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের মতো এটি কোনো সাধারণ গ্রিন কার্ড বাতিলের ঘোষণা নয়। ইতোমধ্যে অনুমোদিত গ্রিন কার্ড এই সিদ্ধান্তের কারণে বাতিল হয়ে যাচ্ছে না। একইভাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কোনো ব্যক্তির বৈধ কর্মভিসাও শুধু এই ঘোষণার কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হচ্ছে না। মূল সমস্যা হচ্ছে, নিয়োগদাতার মাধ্যমে স্থায়ী বসবাসের আবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এখন আটকে যেতে পারে।


এই পার্থক্যটি যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বাংলাদেশি, ভারতীয় এবং অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় পেশাজীবীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর একটিতে কাজ করেন এবং ইতোমধ্যে স্থায়ী বসবাসের প্রক্রিয়া শুরু করে থাকেন, তাহলে তাকে নিজের আবেদন কোন পর্যায়ে রয়েছে তা বুঝতে হবে। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের খবর দেখে আবেদন বাতিল হয়েছে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।


এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতি শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। সরকার বিদেশি কর্মীদের নিয়োগ, কর্মভিসা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদেশি শিক্ষার্থী ও গবেষকদের ব্যবস্থাও আরও কঠোরভাবে পর্যালোচনা করছে। ৮ অক্টোবর প্রশাসন হার্ভার্ড, ইয়েল, স্ট্যানফোর্ড, ব্রাউন এবং ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিসহ নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধেও তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে। সরকারের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে বিদেশি কর্মী ও বিনিময় কর্মসূচির অপব্যবহার করে মার্কিন কর্মীদের বেতন ও চাকরির সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত করা হতে পারে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে তদন্তের অভিযোগ এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে স্থায়ী শ্রম সনদ স্থগিতের বিষয় দুটি আলাদা পদক্ষেপ। তাই এগুলোকে একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বিদেশি কর্মীদের জন্য এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সময়। সরকার জানিয়েছে, স্থগিতাদেশ কতদিন চলবে তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ পদ্ধতি নিয়ে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত ব্যবস্থা চলতে পারে। ফলে যেসব কর্মী স্থায়ী বসবাসের আবেদন করার অপেক্ষায় রয়েছেন, তাদের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের আবেদন একাধিক ধাপে সম্পন্ন হয় এবং প্রতিটি কর্মীর পরিস্থিতি আলাদা। কারও আবেদন নিয়োগদাতার পর্যায়ে থাকতে পারে, কারও শ্রম সনদ অনুমোদিত হতে পারে, আবার কেউ পরবর্তী ধাপে পৌঁছে থাকতে পারেন। তাই একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করলেও সবার ওপর একই ধরনের প্রভাব পড়বে না।

বাংলাদেশি পেশাজীবীদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, স্বাস্থ্যসেবা, হিসাবরক্ষণ এবং অন্যান্য দক্ষ পেশায় বহু বাংলাদেশি বিদেশি কর্মী হিসেবে কাজ করেন। তারা যদি কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্থায়ী বসবাসের আবেদন করে থাকেন, তাহলে প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগ বা অভিবাসন আইনজীবীর কাছ থেকে নিজের আবেদনের বর্তমান অবস্থা জানা জরুরি।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর