চাকরি আছে, কিন্তু নতুন নিয়োগ কমছে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মপ্রার্থীদের জন্য কঠিন সময়
ছাঁটাই এখনো কম থাকলেও নতুন চাকরির সুযোগ ধীর হয়েছে, ফলে বেকার ও নতুন কর্মপ্রার্থীদের চাকরি পাওয়া কঠিন হচ্ছে।
চাকরি আছে, কিন্তু নতুন নিয়োগ কমছে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মপ্রার্থীদের জন্য কঠিন সময়
যুক্তরাষ্ট্রের চাকরির বাজারে এখন একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একদিকে বড় ধরনের ছাঁটাই এখনো খুব কম, অন্যদিকে নতুন কর্মী নিয়োগের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর হয়ে গেছে। ফলে যারা বর্তমানে চাকরিতে আছেন, তাদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হলেও যারা নতুন চাকরি খুঁজছেন, তাদের জন্য সুযোগ পাওয়া আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠছে।
মার্কিন শ্রম দপ্তরের সর্বশেষ সাপ্তাহিক তথ্য অনুযায়ী, ৩ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে নতুন করে বেকার ভাতার জন্য আবেদন করেছেন প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার মানুষ। আগের সপ্তাহে এই সংখ্যা সংশোধিত হিসাবে ছিল ১ লাখ ৯৯ হাজার। চার সপ্তাহের গড়ও কমে প্রায় ১ লাখ ৯৮ হাজারে নেমেছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, টানা চার সপ্তাহ ধরে নতুন বেকার ভাতার আবেদন ২ লাখের নিচে রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের কাছে এটি শ্রমবাজারে ছাঁটাই কম থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। এমন নিম্ন মাত্রার ছাঁটাই দীর্ঘ সময় ধরে দেখা যাওয়া অত্যন্ত বিরল।
তবে এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্রের চাকরির বাজার পুরোপুরি শক্তিশালী হয়ে গেছে।
বরং বর্তমানে এমন একটি পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে যেখানে কোম্পানিগুলো কর্মী ছাঁটাই করতে চাইছে না, আবার নতুন কর্মী নিয়োগও খুব বেশি করছে না। অর্থনীতিবিদরা এটিকে কম নিয়োগ ও কম ছাঁটাইয়ের বাজার হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।
এই পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করছে নতুন চাকরি খোঁজা মানুষের ওপর। যারা চাকরি হারিয়েছেন, তাদের নতুন চাকরি পেতে আগের তুলনায় বেশি সময় লাগছে। দীর্ঘ সময় ধরে বেকার থাকা মানুষের সংখ্যাও উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
মার্কিন শ্রম দপ্তরের সেপ্টেম্বরের মাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির বেকারত্বের হার ছিল ৪ দশমিক ২ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মোট অ-কৃষি খাতে মাত্র ২৯ হাজার নতুন চাকরি যোগ হয়েছে। জুলাই ও আগস্টের চাকরি বৃদ্ধির আগের হিসাবও পরে কমিয়ে সংশোধন করা হয়েছে।
অর্থাৎ, চাকরি হারানোর সংখ্যা কম থাকলেও নতুন চাকরি তৈরির গতি খুব ধীর।
এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ তাদের জন্য যারা যুক্তরাষ্ট্রে নতুন এসেছেন, পড়াশোনা শেষ করেছেন, অভিবাসন প্রক্রিয়ার কারণে কাজের সুযোগ খুঁজছেন অথবা একটি চাকরি থেকে অন্য চাকরিতে যেতে চাইছেন।
বাংলাভাষী অভিবাসীদের জন্য এর অর্থ হলো, শুধু একটি চাকরির ওপর নির্ভর না করে নিজের দক্ষতা বাড়ানো এবং একাধিক ধরনের কাজের সুযোগ খোঁজা এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, পরিবহন, প্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ, খাবার সরবরাহ, বয়স্কদের সেবা এবং বিভিন্ন কারিগরি পেশায় দক্ষ কর্মীদের চাহিদা সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য অনুসরণ করা প্রয়োজন।
নিউইয়র্ক শহরেও চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বিভিন্ন সরকারি প্রশিক্ষণ ও নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। শহরের সরকারি চাকরি সহায়তা কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১০ অক্টোবর কুইন্সে শীতকালীন তুষার পরিষ্কার কাজে অস্থায়ী কর্মী নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে। সেখানে ঘণ্টায় ৩০ ডলার থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট সময়ের পর ৪৫ ডলার পর্যন্ত পারিশ্রমিকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া কুইন্সে টেলিযোগাযোগ ও লাইন স্থাপনের প্রশিক্ষণের সুযোগও রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, যোগ্য ব্যক্তিদের জন্য এই প্রশিক্ষণ বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে এবং নির্দিষ্ট আয়ের সীমার মধ্যে থাকা ব্যক্তিরা আবেদন করতে পারেন।
এ ধরনের প্রশিক্ষণ বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় কমিউনিটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ অনেক অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে এসে প্রথমে কম দক্ষতার কাজ শুরু করলেও পরে কারিগরি দক্ষতা অর্জন করে তুলনামূলক ভালো বেতনের পেশায় যেতে পারেন।
নিউ জার্সিতেও চাকরির বাজারে মিশ্র পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। সর্বশেষ প্রকাশিত আগস্টের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যটিতে মোট বেসরকারি ও সরকারি চাকরির সংখ্যা মাসে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কমেছিল এবং বেকারত্বের হার সামান্য কমে ৪ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল।
নিউ জার্সির কিছু খাতে চাকরি বেড়েছে। অবসর ও আতিথেয়তা খাতে প্রায় ৩ হাজার ৪০০, নির্মাণ খাতে ১ হাজার এবং পরিবহন ও বাণিজ্য খাতে প্রায় ৬০০ চাকরি বেড়েছিল। অন্যদিকে পেশাগত ও ব্যবসায়িক সেবায় প্রায় ৩ হাজার ৫০০ চাকরি কমেছে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত অবশ্য তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী রয়েছে। নিউ জার্সিতে এক বছরের ব্যবধানে বেসরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে প্রায় ২২ হাজার ৯০০ চাকরি বেড়েছে বলে রাজ্যের শ্রম দপ্তরের তথ্য জানিয়েছে।
এ কারণে চাকরি খুঁজছেন এমন বাংলাদেশি-আমেরিকানদের জন্য শুধু দোকান, রেস্তোরাঁ বা পরিবহন খাতে কাজ খোঁজার পরিবর্তে স্বাস্থ্যসেবা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং দক্ষ পেশার দিকেও নজর দেওয়া লাভজনক হতে পারে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে চাকরি পাওয়ার জন্য আবেদন করার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ নেওয়া, জীবনবৃত্তান্ত হালনাগাদ করা এবং সরকারি চাকরি সহায়তা কর্মসূচিতে নিবন্ধন করা গুরুত্বপূর্ণ।
সার্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার এখনো ভেঙে পড়েনি। বরং যারা চাকরিতে আছেন তাদের চাকরি হারানোর ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু যারা চাকরি খুঁজছেন, তাদের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়ছে এবং নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার গতি ধীর হয়েছে।