যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বড় উদ্বেগ, ধীরগতির দাবি জানাচ্ছেন এবার বেশিরভাগ মানুষ
নতুন জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের ৬৪ শতাংশ মানুষ বলছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খুব দ্রুত এগোচ্ছে, নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বড় উদ্বেগ, ধীরগতির দাবি জানাচ্ছেন এবার বেশিরভাগ মানুষ
যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন একটি জাতীয় জরিপে দেশটির ৬৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ জানিয়েছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ বর্তমানে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক দ্রুত এগোচ্ছে। বিপরীতে ২৭ শতাংশ মানুষ মনে করেন প্রযুক্তিটি মোটামুটি সঠিক গতিতে এগোচ্ছে এবং মাত্র ৮ শতাংশ মনে করেন এর বিকাশ আরও দ্রুত হওয়া উচিত। জরিপটি ২৪ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২ হাজার ১৪০ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে পরিচালিত হয়েছে। জরিপের সম্ভাব্য ত্রুটির সীমা ২ দশমিক ৯ শতাংশ।
জরিপটি পরিচালনা করেছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-নরক জনমত গবেষণা কেন্দ্র। ফলাফলে দেখা গেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গতি নিয়ে উদ্বেগ শুধু একটি রাজনৈতিক দলের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষের মধ্যেই এ বিষয়ে যথেষ্ট উদ্বেগ রয়েছে। গণতান্ত্রিক দলের সমর্থকদের মধ্যে ৭৬ শতাংশ মনে করেন প্রযুক্তিটির বিকাশ খুব দ্রুত হচ্ছে। একই মত পোষণ করেন প্রজাতান্ত্রিক দলের ৫৪ শতাংশ সমর্থক। অর্থাৎ রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার নিয়ে দুই পক্ষের মানুষের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য উদ্বেগ রয়েছে।
জরিপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো মানুষের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি। প্রায় ১০ জনের মধ্যে ৮ জন মার্কিন নাগরিক মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অথবা খুব গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। একইভাবে প্রায় সমসংখ্যক মানুষ মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে যাতে মার্কিন কর্মীদের চাকরি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও সরকারের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ প্রযুক্তির উন্নয়নকে সম্পূর্ণ বন্ধ করার চেয়ে নিরাপত্তা, মানবিক নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মসংস্থান রক্ষার সঙ্গে উন্নয়নের ভারসাম্য রাখার দাবি জোরালো হচ্ছে।
কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগের কারণও স্পষ্ট। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তথ্য বিশ্লেষণ, লেখালেখি, গ্রাহকসেবা, হিসাব, নকশা, সফটওয়্যার তৈরি এবং অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে কিছু কর্মী আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে একই কাজ করার জন্য মানুষের প্রয়োজন কমে যেতে পারে। জরিপে অংশ নেওয়া মানুষের বড় অংশ তাই প্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি কর্মীদের সুরক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। বিশেষ করে যেসব পেশায় একই ধরনের কাজ নিয়মিতভাবে করা হয়, সেখানে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বেশি দেখা যাচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব শুধু চাকরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, শিশুদের নিরাপত্তা, পরিবেশের ওপর চাপ এবং তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও মানুষের উদ্বেগ রয়েছে। বড় আকারের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও তথ্যকেন্দ্র প্রয়োজন হওয়ায় বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং পানি সরবরাহের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও আলোচনা বাড়ছে। ফলে প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি এর পরিবেশগত ও সামাজিক মূল্য নিয়েও সরকারের নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠছে।
জরিপে আরও দেখা গেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মোকাবিলায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর মানুষের আস্থা খুব বেশি নয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে যেভাবে কাজ করছেন, তাতে মাত্র ৩১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ অনুমোদন জানিয়েছেন। ৩৯ শতাংশ মানুষ বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মোকাবিলায় ভালো কাজ করার জন্য তারা কোনো রাজনৈতিক দলকেই বিশ্বাস করেন না। ২৩ শতাংশ মানুষ গণতান্ত্রিক দলকে এবং ২১ শতাংশ প্রজাতান্ত্রিক দলকে তুলনামূলকভাবে বেশি আস্থার জায়গায় রেখেছেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সরকারের ভূমিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রযুক্তির অগ্রগতি ধীর করার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর প্রশাসনের যুক্তি হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রযুক্তির বিকাশে পিছিয়ে পড়ে, তাহলে চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে। অন্যদিকে সমালোচকদের একটি অংশ মনে করছে, নিরাপত্তা ও শ্রমবাজারের ঝুঁকি বিবেচনা না করে শুধু প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতাকে অগ্রাধিকার দিলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সামাজিক সমস্যা তৈরি হতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনেও আলোচনা বাড়ছে। তথ্যকেন্দ্র, বিদ্যুৎ ব্যবহার, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ—এসব বিষয় এখন স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতির আলোচনায় উঠে আসছে। তবে নির্বাচনী তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রেও মানুষ এখনো ব্যাপকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভর করছে না। জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ২১ শতাংশ মানুষ বলেছেন তারা নির্বাচনের প্রার্থী বা কোনো ভোটের বিষয় সম্পর্কে তথ্য জানতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেছেন অথবা করার পরিকল্পনা রয়েছে। ভোট দেওয়ার নিয়ম জানতে মাত্র ১২ শতাংশ এবং ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের তথ্য জানতে ১০ শতাংশ মানুষ এটি ব্যবহার করেছেন বা করার পরিকল্পনা করেছেন।
নিউইয়র্কেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা নিয়ে সরাসরি আলোচনা হয়েছে। শহরের পরিষদে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক শুনানিতে প্রযুক্তি খাতের সাবেক কর্মীরা দ্রুত ও পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণহীন প্রযুক্তি উন্নয়নের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে স্বচ্ছতা, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং তথ্য প্রকাশের মতো বিষয় নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নিয়ম তৈরির প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।
তবে জরিপের ফলাফলকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিরুদ্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অবস্থান হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। বরং ফলাফল থেকে বোঝা যায়, অধিকাংশ মানুষ প্রযুক্তির উন্নয়ন পুরোপুরি বন্ধ করতে চাইছেন না; তারা চান উন্নয়ন যেন নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, মানুষের নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হয়। প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা এবং উদ্বেগ দুই দিকই এই জরিপে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থেকেও কর্মীদের নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, শিশুদের সুরক্ষা এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করবে। নতুন জরিপের ফলাফল দেখাচ্ছে, সাধারণ মানুষ শুধু দ্রুত প্রযুক্তিগত উন্নয়ন দেখতে চান না; তাঁরা সেই উন্নয়নের সঙ্গে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং দায়িত্বশীল সরকারি নীতিও চান। ফলে আগামী দিনগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহারের প্রশ্নটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় আলোচনায় পরিণত হতে পারে।