কৃষ্ণসাগরে ড্রোন হামলায় জাহাজডুবি, নিখোঁজ নাবিকদের সন্ধান বন্ধ
বুলগেরিয়ার উপকূলের কাছে ড্রোন হামলায় পণ্যবাহী জাহাজ ডুবে গেছে, নিখোঁজ নাবিকদের সন্ধান বন্ধ হলেও রাশিয়ার দায় নিয়ে তদন্ত চলছে এখনো।
কৃষ্ণসাগরে ড্রোন হামলায় জাহাজডুবি, নিখোঁজ নাবিকদের সন্ধান বন্ধ
বুলগেরিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলে ড্রোন হামলার পর পণ্যবাহী জাহাজ আলফা ওয়াতান ডুবে যাওয়ার ঘটনায় নিখোঁজ নাবিকদের সন্ধান শেষ পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছে বুলগেরিয়া। মঙ্গলবার ভোরে হামলার পর শুরু হওয়া ব্যাপক উদ্ধার অভিযানে উল্টে যাওয়া একটি উদ্ধার নৌকা, তিনটি জীবনরক্ষাকারী ভেলা এবং জাহাজের বিভিন্ন অংশ পাওয়া গেলেও কোনো নাবিকের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
বুলগেরিয়ার সামুদ্রিক প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা রুমেন নিকোলভ জানিয়েছেন, নিখোঁজ নাবিকদের খুঁজে বের করার উদ্ধার অভিযান আর পুনরায় শুরু করা হবে না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে পাওয়া ধ্বংসাবশেষ ও জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম ছাড়া নাবিকদের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। প্রচণ্ড বিস্ফোরণের পর জাহাজটি খুব দ্রুত ডুবে যাওয়ায় জীবিত কাউকে উদ্ধারের সম্ভাবনাও অত্যন্ত ক্ষীণ হয়ে পড়ে।
ঘটনাটি ঘটে ৬ অক্টোবর ভোররাতে বুলগেরিয়ার উপকূল থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে। বুলগেরিয়ার শহর বিয়ালার পূর্ব দিকে দেশটির একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলে তখন দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করছিল। বুলগেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী রুমেন রাদেভ জানিয়েছেন, জাহাজ দুটির ওপর আকাশ ও সমুদ্র থেকে চালানো ড্রোনের মাধ্যমে হামলা হয়। একটি জাহাজ সরাসরি ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ডুবে যায় এবং অন্যটিতে আগুন ধরে যায়।
ডুবে যাওয়া আলফা ওয়াতান টোগোর পতাকা বহন করছিল এবং তুরস্কের সঙ্গে এর মালিকানা ও পরিচালনাগত সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন সামুদ্রিক তথ্যসূত্রে জাহাজটির সঙ্গে তুরস্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। জাহাজটি হামলার আগের দিন ইস্তাম্বুল এলাকায় দেখা গিয়েছিল। পরে এটি রোমানিয়ার সুলিনা বন্দরের দিকে যাচ্ছিল বলে জাহাজ চলাচলের তথ্য থেকে জানা যায়।
জাহাজটির আরোহী নাবিকের সংখ্যা নিয়ে প্রাথমিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তবে সর্বশেষ রয়টার্সের প্রতিবেদনে বুলগেরিয়ার সামুদ্রিক প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১২ জন নাবিক নিখোঁজ থাকার কথা জানানো হয়েছে এবং তাদের সবাই সিরিয়ার নাগরিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে কিছু প্রতিবেদনে ১০ জন কিংবা অন্য সংখ্যার কথা বলা হয়েছিল। ফলে নিখোঁজ নাবিকের চূড়ান্ত সংখ্যা নিয়ে সরকারি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
হামলার সময় আলফা ওয়াতান থেকে বিপদসংকেত পাঠানো হয়েছিল। কাছাকাছি থাকা একটি বুলগেরীয় জাহাজ বিস্ফোরণের শব্দ শুনে ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে তারা উল্টে থাকা উদ্ধার নৌকা, জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম ও ভাসমান ধ্বংসাবশেষ দেখতে পায়। কিন্তু জাহাজটি এত দ্রুত ডুবে যায় যে নিখোঁজ নাবিকদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ খুব সীমিত ছিল।
একই হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত দ্বিতীয় জাহাজটির নাম অ্যাবল। এটি পালাউয়ের পতাকা বহন করছিল এবং এতে ১৮ জন নাবিক ছিলেন। তাদের মধ্যে ১১ জন তুরস্কের এবং সাতজন ভারতের নাগরিক। বুলগেরিয়ার উদ্ধারকারী বাহিনী তাদের সবাইকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়। তবে দুজন নাবিক গুরুতর আহত হন। একজনের শরীরে পোড়ার আঘাত এবং অন্যজনের মাথায় আঘাত লাগে। তাদের চিকিৎসার জন্য বর্ণ শহরে নেওয়া হয়।
অ্যাবল জাহাজটির অবস্থাও পরে গুরুতর হয়ে ওঠে। হামলার কারণে এর পেছনের অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ইঞ্জিন কক্ষে পানি ঢুকে পড়ে। আগুনও জ্বলছিল। বুলগেরিয়ার উদ্ধার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জাহাজটি পরবর্তীতে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তবে ওই জাহাজের সব নাবিককে আগেই উদ্ধার করা সম্ভব হওয়ায় মানবিক বিপর্যয় আরও বড় আকার নেয়নি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন হামলাটি কে চালিয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সরাসরি রাশিয়াকে দায়ী করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ইউক্রেনের নৌবাহিনী ও বুলগেরিয়ার নৌবাহিনীর মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমে পরিচালিত তদন্তে রাশিয়ার সম্পৃক্ততার বিষয়টি উঠে এসেছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, হামলায় আকাশ ও সমুদ্র উভয় ধরনের ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছিল।
তবে এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাচাইয়ের বিষয়টি রয়েছে। বুলগেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী রুমেন রাদেভ জানিয়েছেন, হামলার পরপরই হামলাকারীর পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। তিনি প্রকাশ্যে বলেননি যে রাশিয়া এই হামলা চালিয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, জেলেনস্কি যে বুলগেরিয়ার নৌবাহিনীর সঙ্গে যৌথ তদন্তের কথা বলেছেন, রাদেভ সেই ধরনের যৌথ তদন্তের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। ফলে জেলেনস্কির বক্তব্যকে বর্তমানে অভিযোগ বা দাবি হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত, চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে নয়।
রাশিয়াও হামলার দায় অস্বীকার করেছে। সোফিয়ায় রুশ দূতাবাসের বক্তব্য অনুযায়ী, রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত হামলার তালিকায় আলফা ওয়াতান ও অ্যাবল জাহাজ দুটি ছিল না। রুশ পক্ষ বলেছে, ড্রোনগুলোর জাতীয় পরিচয় নিশ্চিত করতে তদন্তের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা প্রয়োজন। অর্থাৎ রাশিয়া সরাসরি হামলা চালিয়েছে এমন চূড়ান্ত প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
বুলগেরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইলিয়ানা ইয়োতোভাও সরাসরি রাশিয়াকে দায়ী না করে কৃষ্ণসাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির জন্য ইউক্রেন যুদ্ধকে দায়ী করেছেন। তিনি জরুরি নিরাপত্তা বৈঠক ডেকেছেন এবং সমুদ্রপথে বেসামরিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও বেসামরিক জাহাজে হামলার ঘটনাকে গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখা হয়েছে।
ঘটনাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ এটি বুলগেরিয়ার একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর প্রথম জানা বড় ধরনের ড্রোন হামলা বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এলাকাটি বুলগেরিয়ার ভূখণ্ডের সরাসরি জলসীমা নয়। তবে দেশটির অনুসন্ধান ও উদ্ধার দায়িত্বের আওতাভুক্ত সমুদ্র এলাকায় ঘটনাটি ঘটেছে। বুলগেরিয়ার আঞ্চলিক জলসীমা যেখানে উপকূল থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত, এই হামলা তার অনেক দূরে ঘটেছে।
এই হামলার প্রভাব শুধু একটি জাহাজ বা কয়েকজন নাবিকের ভাগ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষ্ণসাগর ইউরোপ, তুরস্ক, ইউক্রেন, রাশিয়া এবং ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ধারাবাহিক হামলা হলে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বাড়বে, বিমার খরচ বাড়তে পারে এবং খাদ্যশস্য ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনের ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। বুলগেরিয়ার প্রধানমন্ত্রীও সতর্ক করেছেন যে যুদ্ধের ভৌগোলিক বিস্তার আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
ঘটনার পর বুলগেরিয়া নিজেদের আকাশ ও সমুদ্র নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। দেশটির সরকার আরও পাঁচটি ভূমি থেকে আকাশে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে তুরস্ক ও রোমানিয়ার সঙ্গে আলোচনা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এর আগে রোমানিয়ার উপকূলের কাছেও একটি বাণিজ্যিক জাহাজে আগুন লাগার ঘটনায় দুজন নিহত হয়েছিলেন। ইউক্রেন সেই ঘটনাকেও রুশ ড্রোন হামলা হিসেবে দাবি করেছে, যদিও রোমানিয়া তখনও আগুনের কারণ চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করেনি। ফলে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে কৃষ্ণসাগরে বেসামরিক জাহাজ নিয়ে পরপর কয়েকটি গুরুতর ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে আলফা ওয়াতান ডুবে যাওয়ার ঘটনায় সবচেয়ে নিশ্চিত তথ্য হলো, বুলগেরিয়ার অর্থনৈতিক অঞ্চলে ড্রোন হামলায় একটি টোগো-পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবে গেছে, তার নাবিকরা নিখোঁজ এবং উদ্ধার অভিযান বন্ধ করা হয়েছে। তিনটি জীবনরক্ষাকারী ভেলা, একটি উল্টে যাওয়া উদ্ধার নৌকা এবং জাহাজের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। একই ঘটনায় দ্বিতীয় জাহাজের ১৮ জন নাবিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু হামলার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করার বিষয়টি এখনো প্রকাশ্যভাবে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়। জেলেনস্কি রাশিয়াকে দায়ী করেছেন, রাশিয়া তা অস্বীকার করেছে এবং বুলগেরিয়া এখনো তদন্তের ফলের অপেক্ষায় রয়েছে।