টম ক্রুজের ডিগার মুক্তির পরই বক্স অফিসে ভরাডুবি, আয় আট মিলিয়ন ডলার
টম ক্রুজের ডিগার প্রথম সপ্তাহান্তে আট মিলিয়ন ডলার আয় করে বড় ধাক্কা খেয়েছে, বিশ্বজুড়ে মোট আয় দাঁড়িয়েছে বিশ মিলিয়ন ডলারে।
টম ক্রুজের ডিগার মুক্তির পরই বক্স অফিসে ভরাডুবি, আয় আট মিলিয়ন ডলার
সিনেমাটি ২ অক্টোবর উত্তর আমেরিকার প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। মুক্তির আগে টম ক্রুজের জনপ্রিয়তা, অস্কারজয়ী পরিচালক আলেহান্দ্রো গঞ্জালেস ইন্যারিতুর সুনাম এবং বড় বাজেটের কারণে ‘ডিগার’কে বছরের অন্যতম আলোচিত সিনেমা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। কিন্তু দর্শক ও সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশিত মাত্রায় না আসায় মুক্তির আগেই সিনেমাটির আয় নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত সেই আশঙ্কাই বাস্তবে পরিণত হয়েছে।
উত্তর আমেরিকার বাজারে ‘ডিগার’ প্রথম সপ্তাহান্তে প্রায় ৩ হাজার ৩২১টি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়েছে। আট মিলিয়ন ডলার আয়ের ফলে প্রতি প্রেক্ষাগৃহে গড় আয়ও খুব বেশি হয়নি। সিনেমাটি ওই সপ্তাহান্তের বক্স অফিস তালিকায় পঞ্চম অবস্থানে ছিল। একই সময়ে ‘ভেরিটি’ নামের সিনেমাটি ৩ কোটি ২৬ লাখ ডলার আয় করে শীর্ষস্থান দখল করে। অর্থাৎ টম ক্রুজের নতুন সিনেমার তুলনায় শীর্ষ সিনেমাটির আয় চার গুণেরও বেশি হয়েছে।
বাণিজ্যিক ফলাফল আরও হতাশাজনক হয়ে উঠেছে সিনেমাটির নির্মাণ ব্যয়ের কথা বিবেচনা করলে। সংশ্লিষ্ট শিল্পসূত্র ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সিনেমাটি নির্মাণে অন্তত ১২ কোটি ৫০ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে এই ব্যয় প্রায় ১৫ কোটি ডলারের কাছাকাছি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর সঙ্গে প্রচারণা ও বিপণনে আরও বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে প্রথম সপ্তাহান্তে বিশ্বব্যাপী মাত্র দুই কোটি ডলার আয় সিনেমাটির আর্থিক অবস্থাকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। আট মিলিয়ন ডলার আয় মানে সিনেমাটির চূড়ান্ত ক্ষতির পরিমাণ আট মিলিয়ন ডলার নয়। সিনেমাটি এখনও প্রেক্ষাগৃহে চলছে এবং পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে আরও আয় করতে পারে। একই সঙ্গে প্রেক্ষাগৃহের আয়ের পুরো অর্থ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের হাতে যায় না। প্রেক্ষাগৃহ মালিক ও পরিবেশকদের সঙ্গে আয় ভাগাভাগি করতে হয়। তাই সিনেমাটির চূড়ান্ত লাভ বা ক্ষতির হিসাব এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তবে বর্তমান সূচনা যে অত্যন্ত দুর্বল, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
‘ডিগার’ পরিচালনা করেছেন অস্কারজয়ী মেক্সিকান নির্মাতা আলেহান্দ্রো গঞ্জালেস ইন্যারিতু। তিনি ‘বার্ডম্যান’ ও ‘দ্য রেভেন্যান্ট’-এর মতো প্রশংসিত সিনেমার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। নতুন সিনেমাটিতে তিনি প্রচলিত বিনোদনের বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, পরিবেশ বিপর্যয়, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ধনী ব্যক্তিদের সামাজিক প্রভাবকে কালো হাস্যরসের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে ডিগার রকওয়েল নামের এক ক্ষমতাবান তেল ব্যবসায়ী। চরিত্রটি পরিবেশের ওপর ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব ফেললেও নিজেকে মানবজাতির রক্ষাকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়। তার কর্মকাণ্ডের ফলে তৈরি হওয়া পরিবেশগত বিপর্যয় মোকাবিলার পাশাপাশি নিজের ভাবমূর্তি রক্ষা করাও তার অন্যতম লক্ষ্য হয়ে ওঠে। সিনেমাটির ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিভঙ্গির মূল লক্ষ্য এখানেই।
টম ক্রুজের জন্য সিনেমাটি ছিল বিশেষ ধরনের অভিনয়ের সুযোগ। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি মূলত দুর্দান্ত শারীরিক সক্ষমতা, ঝুঁকিপূর্ণ দৃশ্য এবং অ্যাকশননির্ভর চরিত্রের জন্য দর্শকদের কাছে পরিচিত। কিন্তু ‘ডিগার’-এ তাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের চরিত্রে দেখা গেছে। ধূসর চুল, বিশেষ সাজসজ্জা এবং পরিবর্তিত চেহারায় তিনি একজন ক্ষমতাবান তেল ব্যবসায়ীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন। লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিনেমাটিতে ক্রুজকে তার পরিচিত চেহারা থেকে প্রায় সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
সিনেমাটিতে টম ক্রুজের সঙ্গে অভিনয় করেছেন রিজ আহমেদ, জন গুডম্যান, স্যান্ড্রা হুলার, মাইকেল স্টুলবার্গ এবং জেসি প্লেমনস। এত শক্তিশালী অভিনয়শিল্পী থাকা সত্ত্বেও সিনেমাটি দর্শকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যবসা করতে পারেনি।
সমালোচকদের প্রতিক্রিয়াও সিনেমাটির জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথ্য যাচাইয়ের সময় জনপ্রিয় সমালোচকভিত্তিক চলচ্চিত্র মূল্যায়ন সাইটে সিনেমাটির সমালোচক অনুমোদনের হার প্রায় ৫১ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। দর্শকদের প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে ভালো হলেও সেটিও সিনেমাটিকে বড় উদ্বোধনী আয় এনে দিতে পারেনি। দর্শক জরিপে সিনেমাটি ‘সি প্লাস’ মানের ফল পেয়েছে, যা বড় বাজেটের সিনেমার জন্য খুব শক্তিশালী সূচনা হিসেবে বিবেচিত হয় না।
অনেক সমালোচক সিনেমাটির সাহসী বিষয় ও টম ক্রুজের অভিনয়ের প্রশংসা করলেও গল্পের অতিরিক্ত জটিলতা, অতিরঞ্জিত ব্যঙ্গ এবং হাস্যরসের অসম ভারসাম্য নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। আবার কেউ কেউ মনে করেছেন, সিনেমাটি প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে এমন একটি বিষয় নিয়ে কাজ করেছে, যা বর্তমান বিশ্বের পরিবেশ ও ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ফলে সিনেমাটি পুরোপুরি ব্যর্থ নাকি ভুল সময়ে মুক্তি পাওয়া একটি উচ্চাভিলাষী কাজ, তা নিয়েও মতভেদ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিনেমাটির দুর্বল ব্যবসার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, দর্শকদের বড় একটি অংশ টম ক্রুজকে অ্যাকশনধর্মী চরিত্রে দেখতে অভ্যস্ত। দ্বিতীয়ত, ‘ডিগার’-এর বিষয়বস্তু তুলনামূলকভাবে ভারী এবং ব্যঙ্গনির্ভর। তৃতীয়ত, সমালোচকদের বিভক্ত প্রতিক্রিয়া সাধারণ দর্শকদের আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে। চতুর্থত, বড় বাজেটের সিনেমাটির বিপণন কৌশল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এখানে টম ক্রুজের সাম্প্রতিক সাফল্যের সঙ্গে তুলনাটিও গুরুত্বপূর্ণ। ‘মিশন ইম্পসিবল’ সিরিজ এবং ‘টপ গান: ম্যাভেরিক’-এর মতো সিনেমার মাধ্যমে তিনি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজেকে বিশ্বব্যাপী অন্যতম নির্ভরযোগ্য তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সেই কারণে ‘ডিগার’-এর দুর্বল উদ্বোধনী আয়কে আরও বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে এটিকে তার ক্যারিয়ারের অন্যতম দুর্বল উদ্বোধনী ফলাফল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে টম ক্রুজের ক্যারিয়ারের জন্য একটি সিনেমার ব্যর্থতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হবে, তা এখনই বলা কঠিন। তিনি এর আগেও দুর্বল ব্যবসা করা সিনেমার পর বড় সাফল্যে ফিরেছেন। তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে এমন উদাহরণ রয়েছে যেখানে সমালোচনা বা দুর্বল প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ার পরও পরবর্তী প্রকল্পে তিনি শক্তিশালীভাবে ফিরে এসেছেন। তাই ‘ডিগার’-এর ফলাফলকে তার পুরো ক্যারিয়ারের সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে সিনেমাটির দুর্বল ফলাফল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্নার ব্রাদার্সের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটির প্রেক্ষাগৃহ ব্যবসা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির দেশীয় আয় ছিল প্রায় ১৮০ কোটি ডলার, যেখানে চলতি বছরের একই সময়ে তা ছিল প্রায় ৪৩ কোটি ৭৭ লাখ ডলার।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা পরিবর্তনের ঘটনাও। ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারির সঙ্গে প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্সের বিশাল অঙ্কের অধিগ্রহণ চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পথে রয়েছে। ফলে ‘ডিগার’-এর দুর্বল ফলাফল প্রতিষ্ঠানটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসেছে। নতুন ব্যবস্থাপনা ভবিষ্যতে বড় বাজেটের মৌলিক গল্পের সিনেমায় কতটা বিনিয়োগ করবে, সেটিও এখন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।