কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নতুন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন
উত্তর কোরিয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে বলে দাবি করেছে, তবে এর সক্ষমতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নতুন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন
উত্তর কোরিয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাঝারি পাল্লার একটি কৌশলগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালানোর দাবি করেছে। শনিবার ৩ অক্টোবর ভোরে দেশটির পূর্ব উপকূলীয় ওয়ানসান এলাকা থেকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রটি পূর্ব সাগরের দিকে গিয়ে ৭০০ কিলোমিটারের বেশি পথ অতিক্রম করেছে। পরে উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকেও পরীক্ষাটির কথা নিশ্চিত করা হয়।
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং জানিয়েছেন, ওই ক্ষেপণাস্ত্রটি ছিল মাঝারি পাল্লার একটি কৌশলগত অস্ত্র। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কিম জং উন নিজে পরীক্ষাটি পর্যবেক্ষণ করেন। পরীক্ষাটি একটি বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত অগ্নিশক্তি ইউনিটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। উত্তর কোরিয়ার সরকারি সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে এবারের পরীক্ষার সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো ক্ষেপণাস্ত্রটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহারের দাবি। কিম ইয়ো জং বলেছেন, নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে ক্ষেপণাস্ত্রটি নিচু উচ্চতায় উড়ার সময় নিজের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। তার দাবি, ক্ষেপণাস্ত্রটির জন্য অন্তত চার ধরনের উড্ডয়নপথ নির্ধারণ করা সম্ভব এবং লক্ষ্য ও সামরিক প্রয়োজন অনুযায়ী এগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে।
উত্তর কোরিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রটি এমন একটি বিশেষ ধরনের গতিপথ অনুসরণ করতে পারে, যার ফলে প্রচলিত পদ্ধতিতে ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও অনুসরণ করা কঠিন হতে পারে। কিম ইয়ো জং দাবি করেছেন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সামরিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাগুলো ক্ষেপণাস্ত্রটির পুরো গতিপথ অনুসরণ করতে পারেনি। তিনি দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের প্রকাশিত উড্ডয়ন দূরত্বের তথ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী অবশ্য পরীক্ষার সময় ক্ষেপণাস্ত্রটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেছে বলে জানিয়েছে। দেশটির যৌথ সামরিক সদর দপ্তর জানায়, স্থানীয় সময় শনিবার সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে ওয়ানসান এলাকা থেকে ক্ষেপণাস্ত্রটি ছোড়া হয়। দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ উৎক্ষেপণের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করছিল এবং ক্ষেপণাস্ত্রটির সঠিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে বিশ্লেষণ চালাচ্ছে।
জাপানের প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষও ক্ষেপণাস্ত্রটির গতিপথ পর্যবেক্ষণ করেছে। জাপানের হিসাবে ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রায় ৬৮০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের প্রকাশিত হিসাবের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। উত্তর কোরিয়া এই পার্থক্যকে নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্রের বিশেষ গতিপথের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে। তবে শুধু উড্ডয়ন দূরত্বের পার্থক্য থেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার বা ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নত গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা প্রমাণিত হয় না।
ফ্যাক্ট যাচাইয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উত্তর কোরিয়ার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের দাবিটি এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি। দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র ক্ষেপণাস্ত্রটির প্রকৃত ধরন, গতি, উচ্চতা এবং উড্ডয়নপথ বিশ্লেষণ করছে। প্রকাশ্যে এমন কোনো স্বাধীন প্রযুক্তিগত প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে ক্ষেপণাস্ত্রটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে নিচু উচ্চতায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে গতিপথ পরিবর্তন করেছে। তাই এই অংশটি বর্তমানে উত্তর কোরিয়ার দাবি হিসেবেই উপস্থাপন করা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ক্ষেপণাস্ত্রটির শ্রেণিবিন্যাস। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী প্রাথমিকভাবে এটিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে শনাক্ত করলেও উৎক্ষেপণের পরপরই এর নির্দিষ্ট ধরন জানায়নি। পরে উত্তর কোরিয়া এটিকে মাঝারি পাল্লার কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র বলে ঘোষণা করে। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বিশ্লেষণে ক্ষেপণাস্ত্রটির সর্বোচ্চ উচ্চতা প্রায় ৯০ কিলোমিটার ছিল বলে পরবর্তী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে এবং প্রকৃত উড্ডয়ন দূরত্ব ৭০০ কিলোমিটারের বেশি হতে পারে বলেও ধারণা দেওয়া হয়েছে।
উত্তর কোরিয়ার এবারের পরীক্ষা এমন সময়ে হলো, যখন দুই কোরিয়ার মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর অসামরিক অঞ্চলে স্থলমাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার কয়েকজন সেনা আহত হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ শুরু হয়। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাতিসংঘের কমান্ডের তদন্তে উত্তর কোরিয়ার একটি সক্রিয় স্থলমাইনের উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে। তবে উত্তর কোরিয়া ওই অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবিকেও প্রত্যাখ্যান করেছে।
এর মাত্র কয়েক দিন পর নতুন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা দুই কোরিয়ার সামরিক উত্তেজনায় আরও একটি ঘটনা যোগ করেছে। উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়াকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বর্ণনা করে আসছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র এসব মহড়াকে প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তুলে ধরে। সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখেও উত্তর কোরিয়া ওয়ানসান এলাকা থেকে দুটি স্বল্প পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। সেগুলোর একটি প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার এবং অন্যটি ৬০০ কিলোমিটারের বেশি পথ অতিক্রম করেছিল বলে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছিল।
সেপ্টেম্বরের ওই পরীক্ষার পর উত্তর কোরিয়া একটি নতুন অস্ত্র ব্যবস্থার পরীক্ষা সফল হওয়ার কথাও জানিয়েছিল। দেশটির প্রকাশিত ছবিতে কিম জং উনকে একটি উড্ডয়নপথের তথ্য পর্যবেক্ষণ করতে দেখা যায়। দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্লেষকদের মতে, সেটি উন্নত ধরনের অতিদ্রুতগতির ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে সেখানেও উত্তর কোরিয়ার প্রকাশিত তথ্যের কিছু অংশ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এবারের পরীক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দাবি তাই উত্তর কোরিয়ার সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়নের বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির নেতা কিম জং উন সামরিক ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়া ক্ষেপণাস্ত্র, চালকবিহীন ব্যবস্থা এবং অন্যান্য নির্ভুল আঘাত হানার সক্ষমতা উন্নয়নের চেষ্টা করছে।
তবে উত্তর কোরিয়ার দাবি অনুযায়ী এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্ষেপণাস্ত্রকে প্রায় অপ্রতিরোধ্য করে তোলা হয়েছে—এমন কোনো স্বাধীন প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে নেই। ক্ষেপণাস্ত্রের নিচু উচ্চতায় গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা থাকলেও সেটি কতটা নির্ভুল, কত দ্রুত গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে এবং বাস্তব যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তা কতটা কার্যকর হবে, সেসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে পরীক্ষার সময় প্রদর্শিত একটি নির্দিষ্ট সক্ষমতা এবং বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে সেই সক্ষমতা প্রয়োগ করার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একাধিক প্রস্তাবে উত্তর কোরিয়াকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎক্ষেপণ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের নথি অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও সংশ্লিষ্ট উৎক্ষেপণগুলো নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় সামরিক কমান্ড জানিয়েছে, তারা ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের বিষয়ে অবগত এবং মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে সমন্বয় করছে। প্রাথমিক মূল্যায়নে এই উৎক্ষেপণ যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড, সেনাসদস্য বা মিত্রদের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করেনি বলে মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে।