দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ৮৪০ কোটি ডলারের তেল প্রকল্পের দাবি ট্রাম্পের, অস্বীকার সিউলের
ট্রাম্পের ঘোষণায় নতুন তেল প্রকল্পের দাবি উঠলেও দক্ষিণ কোরিয়া বলছে, এটি দুই দেশের চুক্তির অন্তর্ভুক্ত নয় বলে তারা জানে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ৮৪০ কোটি ডলারের তেল প্রকল্পের দাবি ট্রাম্পের, অস্বীকার সিউলের
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে নতুন করে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন। ২ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি দাবি করেন, দুই দেশের চুক্তি আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং এতে ৮৪০ কোটি মার্কিন ডলারের একটি অতিরিক্ত তেল উত্তোলন প্রকল্প যুক্ত হয়েছে। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্প যুক্তরাষ্ট্রে আরও বেশি তেল ও গ্যাস উৎপাদনে সহায়তা করবে এবং ভবিষ্যতে দেশটির জ্বালানি প্রাধান্য ও নিরাপত্তা শক্তিশালী করবে।
তবে ট্রাম্পের ঘোষণার পরই দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য এসেছে। দেশটির শিল্প মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত তেল উত্তোলন প্রকল্পটি দুই দেশের কৌশলগত বিনিয়োগ চুক্তির অংশ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার জানা নেই। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত বিনিয়োগ বিষয়ে যে সমঝোতা হয়েছে, তা গত বছরের যৌথ তথ্যপত্র ও সরকারি ঘোষণায় নির্ধারিত বিষয়গুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ট্রাম্পের নতুন ঘোষণার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক চ্যানেলে যোগাযোগ করা হয়েছে বলেও ওই কর্মকর্তা জানান।
এই বিরোধের কারণে ৮৪০ কোটি ডলারের প্রকল্পটিকে এখনই চূড়ান্ত দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ হিসেবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না। বরং বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটন ও সিউলের মধ্যে সমঝোতার ব্যাখ্যায় পার্থক্য দেখা দিয়েছে। ট্রাম্প প্রকল্পটিকে বিদ্যমান চুক্তির অগ্রগতি হিসেবে তুলে ধরলেও দক্ষিণ কোরিয়া বলছে, তাদের স্বীকৃত চুক্তির নথিতে এমন কোনো প্রকল্প নেই। ফলে প্রকল্পটির অর্থায়ন, অবস্থান, বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা সময়সূচি সম্পর্কে এখনো পরিষ্কার সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি।
অতিরিক্ত তেল উত্তোলন বলতে সাধারণত পুরোনো বা পরিপক্ব তেলক্ষেত্র থেকে প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে আরও তেল বের করে আনার প্রক্রিয়াকে বোঝায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ চাপ বাড়ানো বা অন্যান্য পদ্ধতির মাধ্যমে আগে উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি এমন তেল সংগ্রহ করা হয়। ট্রাম্প তাঁর ঘোষণায় প্রকল্পটির নির্দিষ্ট অবস্থান বা কোন তেলক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে এটি হবে, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি।
এই ঘোষণার পেছনে বৃহত্তর মার্কিন-দক্ষিণ কোরিয়া অর্থনৈতিক চুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ। গত বছর দুই দেশ একটি বড় বাণিজ্যিক সমঝোতায় পৌঁছায়। সেই সমঝোতায় দক্ষিণ কোরিয়ার যুক্তরাষ্ট্রে মোট ৩৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির কথা বলা হয়। এর মধ্যে ১৫০ বিলিয়ন ডলার যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ নির্মাণ খাতের জন্য এবং বাকি অর্থ কৌশলগত বিনিয়োগের জন্য নির্ধারিত হয়েছিল। এর বিনিময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কমানোর ব্যবস্থা করা হয়।
সম্প্রতি এই বৃহত্তর বিনিয়োগ পরিকল্পনার আওতায় দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন জ্বালানি ও অবকাঠামো প্রকল্পের কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে টেক্সাসে বড় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, টেক্সাসের একটি বিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ২২৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্যকেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্যেও ব্যবহৃত হতে পারে।
আলাস্কায় প্রাকৃতিক গ্যাস অবকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টিও সাম্প্রতিক মার্কিন-দক্ষিণ কোরিয়া আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প প্রায় ৫৪০০ কোটি ডলারের একটি দীর্ঘ পাইপলাইন প্রকল্পের কথা বলেছেন। তবে দক্ষিণ কোরিয়া স্পষ্ট করেছে, প্রকল্পটির বাণিজ্যিক কার্যকারিতা ও আইনগত বিষয় পর্যালোচনা না করে তারা চূড়ান্ত বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেয়নি। ফলে এই ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণার সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
এদিকে ট্রাম্পের নতুন তেল প্রকল্পের ঘোষণা এমন সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি মূল্য এবং সরবরাহ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতও বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ তেল ও গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগকে ট্রাম্প তাঁর জ্বালানি নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরছেন। তাঁর বক্তব্যে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বৃদ্ধির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঘোষণার পাশাপাশি বাস্তব চুক্তির নথি যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৮৪০ কোটি ডলারের অতিরিক্ত তেল উত্তোলন প্রকল্পের বিষয়ে ট্রাম্পের ঘোষণা নিশ্চিতভাবে পাওয়া গেলেও দক্ষিণ কোরিয়া এটিকে দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তির অংশ হিসেবে স্বীকার করেনি। ফলে প্রকল্পটি সত্যিই চূড়ান্ত হয়েছে কি না, দক্ষিণ কোরিয়া অর্থায়নে যুক্ত হবে কি না এবং এর বাস্তবায়ন কোথায় হবে এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
সুতরাং বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে সবচেয়ে নির্ভুল অবস্থান হলো, ট্রাম্প ৮৪০ কোটি ডলারের অতিরিক্ত তেল উত্তোলন প্রকল্পের ঘোষণা দিয়েছেন, কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়া বলছে প্রকল্পটি তাদের স্বীকৃত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির অংশ নয়। এ কারণে ঘোষণাটিকে সম্পূর্ণ চূড়ান্ত বিনিয়োগ চুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা এখনই সমীচীন হবে না।