নভেম্বর ভোটের পর ইরান যুদ্ধ জয়ের আশা ট্রাম্পের, দ্রুত সমাপ্তির নতুন বার্তা
সাত মাসের সংঘাতের পর নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর যুদ্ধ শেষ হবে বলে আশা জানিয়েছেন ট্রাম্প, তবে বাস্তব পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত।
নভেম্বর ভোটের পর ইরান যুদ্ধ জয়ের আশা ট্রাম্পের, দ্রুত সমাপ্তির নতুন বার্তা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান দীর্ঘ সংঘাতের দ্রুত সমাপ্তি নিয়ে আবারও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যটির সঙ্গে সাম্প্রতিক নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনের কিছু পার্থক্য রয়েছে। যাচাই করে দেখা গেছে, ট্রাম্প সত্যিই বলেছেন যে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই শেষ হতে পারে। কিন্তু তিনি সরাসরি এমন নিশ্চয়তা দেননি যে যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই নির্বাচনের পর যুদ্ধ জিতে যাবে। বরং তিনি বলেছেন, ইরান আর দীর্ঘ সময় মার্কিন অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ সহ্য করতে পারবে না এবং নির্বাচনের পর সংঘাতের অবসান ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।
গত ৯ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, নভেম্বরের নির্বাচনের পরপরই যুদ্ধ শেষ হবে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর বক্তব্যের যুক্তি ছিল, ইরান দীর্ঘস্থায়ী চাপের মুখে রয়েছে এবং নির্বাচনে প্রভাব ফেলার চেষ্টা করলেও দেশটি আর বেশি দিন পরিস্থিতি ধরে রাখতে পারবে না। একই বক্তব্যে তিনি যুদ্ধ শেষ হলে জ্বালানির দামও কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছিলেন। তবে তখনও তিনি কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি বাতিল করেননি।
এরপর সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহেও ট্রাম্প সংঘাতের দ্রুত সমাপ্তি নিয়ে আশাবাদী অবস্থান বজায় রাখেন। ২৮ সেপ্টেম্বর তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র খুব শিগগিরই ইরান সংঘাতে জয়ী হবে এবং একভাবে অথবা অন্যভাবে পরিস্থিতির সমাধান হবে। একই সময়ে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে সংঘাত শেষ করার বিষয়ে যোগাযোগ চলছিল বলেও তিনি জানান।
কিন্তু অক্টোবরের শুরুতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ইরান যুদ্ধ বন্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ পুনরায় চালুর বিষয়ে একটি প্রস্তাব দিলেও ট্রাম্প তা যথেষ্ট মনে করেননি। ইরানের প্রস্তাবের মধ্যে ছিল সমুদ্রপথ খুলে দেওয়া, যুদ্ধ বন্ধ করা এবং পরমাণু বিষয়ে আলোচনা পুনরায় শুরু করা। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ও কিছু অর্থনৈতিক চাপ শিথিল করার বিষয়ও ছিল। ট্রাম্প প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং আলোচনার পাশাপাশি সামরিক বিকল্প খোলা রেখেছেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ট্রাম্প নভেম্বরের নির্বাচনের পর আবারও ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনার কথা বলেছেন। এর অর্থ হলো, নির্বাচনের পর যুদ্ধ শেষ হবে এমন একক ও নিশ্চিত পরিকল্পনা এখনো নেই। বরং কূটনৈতিক সমাধান ব্যর্থ হলে নির্বাচনের পর সামরিক অভিযান আরও জোরদার হতে পারে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ‘নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ জিতে যাবে’ বক্তব্যটিকে সরাসরি নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা বিভ্রান্তিকর।
এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা কমার বদলে সামরিক প্রস্তুতির মাত্রা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরও কয়েক হাজার সেনা ও যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এর ফলে অক্টোবরের শেষ নাগাদ ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। একাধিক বিমানবাহী রণতরী ও বিপুলসংখ্যক বিমান মোতায়েনের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে।
এই সামরিক প্রস্তুতি ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য তৈরি করেছে। একদিকে তিনি যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা তুলে ধরছেন, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে বড় সামরিক শক্তি মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাচ্ছে। এর ফলে ধারণা করা হচ্ছে, ওয়াশিংটন কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ খোলা রাখলেও ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর জন্য সামরিক বিকল্প প্রস্তুত রাখছে।
সংঘাতটির অর্থনৈতিক প্রভাবও এখন মার্কিন রাজনীতিতে বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ও গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ বেড়েছে। তেলের দামও বিভিন্ন সময়ে তীব্রভাবে বেড়েছে। ট্রাম্প নিজেও যুদ্ধ শেষ হলে জ্বালানির দাম কমে আসার সম্ভাবনার কথা বলেছেন।
অন্যদিকে মার্কিন জনগণের মধ্যে যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে প্রায় ৭০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া মূল্যবান নয়। এমন পরিস্থিতিতে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
রাজনৈতিকভাবে যুদ্ধের ফলাফলও ট্রাম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল থেকেও সংঘাতটি নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ক্ষতি করতে পারে এমন উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়িত্ব, মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানির ব্যয় ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।