বিমান হামলার সন্দেহে ইরানকে ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি, প্রমাণ মিললে হবে ভয়াবহ প্রতিশোধ
ইসরায়েলগামী উড়োজাহাজে সহপাইলটের হামলার ঘটনায় ইরানের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিললে কঠোর সামরিক জবাবের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে।
বিমান হামলার সন্দেহে ইরানকে ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি, প্রমাণ মিললে হবে ভয়াবহ প্রতিশোধ
ইসরায়েলগামী একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের সহপাইলটের বিরুদ্ধে মাঝআকাশে পাইলটকে ছুরিকাঘাত এবং উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করার অভিযোগের পর নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ওই ঘটনার সঙ্গে ইরানের কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে তেহরানকে কঠোর জবাব দেওয়া হবে। তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসা তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিশ্চিত হয়নি এবং তদন্তকারীরা সম্ভাব্য উদ্দেশ্য ও পেছনের যোগাযোগ খতিয়ে দেখছেন।
ঘটনাটি ঘটে গত বুধবার দুবাই থেকে তেল আবিবগামী একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে। উড়োজাহাজটি সৌদি আরবের আকাশসীমার কাছাকাছি পৌঁছানোর সময় দুই পাইলটের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সহপাইলট ক্যাপ্টেনকে ছুরিকাঘাত করেন এবং পরে উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় উড়োজাহাজটি দ্রুত উচ্চতা হারাতে শুরু করে এবং যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
আক্রান্ত ক্যাপ্টেন ভারতীয় নাগরিক স্মিত মাচ্ছার। গুরুতর আহত অবস্থাতেও তিনি ককপিটের দরজা খোলার সুযোগ তৈরি করেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এরপর কয়েকজন যাত্রী ও উড়োজাহাজের কর্মী ককপিটে ঢুকে অভিযুক্ত সহপাইলটকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। পরে অতিরিক্ত প্রশিক্ষিত উড়োজাহাজকর্মীরা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিমানটিকে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করান। ঘটনায় যাত্রীদের কেউ গুরুতর আহত হননি। আহত ক্যাপ্টেনকে পরবর্তী চিকিৎসার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতে নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার পর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুতর বলে উল্লেখ করেন। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সহপাইলটের আচরণ, তার পূর্ববর্তী কর্মকাণ্ড এবং সম্ভাব্য উগ্রপন্থী যোগাযোগসহ বিভিন্ন বিষয় তদন্ত করা হচ্ছে। তবে তদন্তের এই পর্যায়ে তার সঙ্গে কোনো রাষ্ট্রীয় শক্তির সরাসরি যোগাযোগ ছিল কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা হয়নি।
এমন পরিস্থিতিতেই বৃহস্পতিবার ট্রাম্পকে ইরানের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। তিনি বলেন, যদি তদন্তে ইরানের যোগসূত্র পাওয়া যায়, তাহলে ইরানকে খুব কঠিন মূল্য দিতে হবে। ট্রাম্পের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যুক্তরাষ্ট্র ঘটনাটিকে কেবল একটি বিমান নিরাপত্তা সংকট হিসেবে দেখছে না; বরং এর পেছনে বিদেশি রাষ্ট্রের নির্দেশনা বা সহযোগিতা রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
তবে এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সম্পৃক্ততার কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, হামলার উদ্দেশ্য এখনো তদন্তাধীন। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইসরায়েলসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি নিয়ে আলাদাভাবে অনুসন্ধান করছে। ফলে ট্রাম্পের বক্তব্যকে বর্তমানে একটি সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে, প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে নয়।
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অভিযুক্ত সহপাইলটের পরিচয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাকে ওমানের নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তার ব্যক্তিগত ইতিহাস, মানসিক অবস্থা, সম্ভাব্য উগ্রপন্থী মতাদর্শ এবং কারও সঙ্গে যোগাযোগ ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় রয়েছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা তার সম্ভাব্য উগ্রপন্থী প্রভাবের কথা বললেও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি।
ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। চলমান সংঘাত, সামরিক প্রস্তুতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি সেনা মোতায়েনের কারণে যেকোনো নতুন হামলা বা সন্দেহজনক ঘটনার রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব অনেক বেশি হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সামরিক শক্তি পাঠিয়েছে এবং ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়নি।
বিশ্লেষকদের কাছে তাই উড়োজাহাজের ঘটনাটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন বিমান নিরাপত্তা ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যদি তদন্তে প্রমাণ পাওয়া যায় যে অভিযুক্ত ব্যক্তি কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থা, সশস্ত্র গোষ্ঠী বা বিদেশি নেটওয়ার্কের নির্দেশনায় কাজ করেছেন, তাহলে এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বিপরীতে, যদি তদন্তে ব্যক্তিগত মানসিক সমস্যা, একক উগ্রপন্থী কর্মকাণ্ড বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত কারণ সামনে আসে, তাহলে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক প্রতিক্রিয়ার যুক্তি অনেকটাই দুর্বল হয়ে যাবে।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি সত্য । উড়োজাহাজে হামলা, পাইলটকে ছুরিকাঘাত এবং উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের সম্ভাব্য চেষ্টা এসব ঘটনা তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হলেও এর সঙ্গে ইরানের যোগসূত্র এখনো নিশ্চিত হয়নি। তাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অবস্থান হলো, ঘটনাটি গুরুতর এবং আন্তর্জাতিক তদন্তাধীন; আর ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক প্রতিক্রিয়া নির্ভর করবে তদন্তে কী ধরনের প্রমাণ সামনে আসে তার ওপর।