ইরান ভেঙে পড়ার পথে, সহজ জয়ের দাবি ট্রাম্পের, বাড়ছে যুদ্ধশেষের নতুন চাপ
ইরান ভেঙে পড়ার পথে, সহজ জয়ের দাবি ট্রাম্পের, বাড়ছে যুদ্ধশেষের নতুন চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে নিয়ে আবারও কঠোর বার্তা দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার টেক্সাসের ডেন্টনে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ইরান বর্তমানে ভেঙে পড়ার অবস্থায় রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র এখন খুব সহজেই জয় পেতে পারে। একই বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর আগে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তখন ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য তিন থেকে চার সপ্তাহ, কিংবা তারও কম সময় ছিল।
ট্রাম্পের সর্বশেষ বক্তব্যের মূল অংশটি যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, তিনি সত্যিই ইরানকে ‘ভেঙে পড়ার’ অবস্থায় রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সহজ জয়ের কথা বলেছেন। বক্তব্যটি টেক্সাসের ডেন্টনে পিটারবিল্ট কারখানা পরিদর্শনের সময় দেওয়া হয়। একই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না এবং চলমান সংঘাত খুব শিগগিরই শেষ হতে পারে।
তবে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সময়সীমা নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যকে সরাসরি স্বাধীনভাবে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। কারণ তিন থেকে চার সপ্তাহের হিসাবটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের আগের বক্তব্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। উইটকফ জানিয়েছিলেন, ইরানের বিশ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে অস্ত্র তৈরির উপযোগী মাত্রায় নিতে প্রায় তিন থেকে চার সপ্তাহ লাগতে পারে। ষাট শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ক্ষেত্রে সময় আরও কম হতে পারে বলেও তিনি দাবি করেছিলেন।
অর্থাৎ, তিন থেকে চার সপ্তাহের হিসাবটি সরাসরি ‘ইরান তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারত’ এমন নিশ্চিত প্রমাণ নয়। ইউরেনিয়ামকে অস্ত্র তৈরির উপযোগী মাত্রায় সমৃদ্ধ করা এবং একটি কার্যকর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা একই বিষয় নয়। অস্ত্র তৈরির জন্য আরও প্রযুক্তিগত, প্রকৌশলগত ও সামরিক সক্ষমতা প্রয়োজন।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রকৃত বর্তমান অবস্থাও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা জানিয়েছিল, ইরানের মজুত ইউরেনিয়াম, কেন্দ্রাতিগ যন্ত্র এবং সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামের পূর্ণাঙ্গ হিসাব যাচাই করার ক্ষেত্রে তাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ফলে বর্তমানে তেহরানের প্রকৃত পারমাণবিক সক্ষমতা কতটা অক্ষত রয়েছে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সমঝোতা নিয়ে তাঁর অবিশ্বাস। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হলেও তেহরান সেটি মানবে কি না, সে বিষয়ে তাঁর সন্দেহ রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হলে তা মানার নিশ্চয়তা থাকলেও ইরানের ক্ষেত্রে চুক্তি না মানার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই বক্তব্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পারস্পরিক অবিশ্বাস। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এর আগেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, আগের পারমাণবিক সমঝোতা থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার পর নতুন কোনো চুক্তির ওপর আস্থা রাখা কঠিন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট দাবি করেছেন, সেপ্টেম্বর মাসে ইরান থেকে কোনো অপরিশোধিত তেল জাহাজে তোলা হয়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তেল রপ্তানি কমে যাওয়ায় ইরানের অর্থনৈতিক চাপ আরও তীব্র হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোও মূলত মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যে হরমুজ প্রণালিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ওই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে তেল পরিবহন সচল রেখেছে, অন্যদিকে ইরানের তেল পরিবহন কঠোরভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ছে বলে তিনি দাবি করেন।
তবে সামরিক সংঘাতে দ্রুত জয় পাওয়ার ট্রাম্পের বক্তব্যকে ভবিষ্যতের নিশ্চিত ফলাফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। যুদ্ধের সামরিক ফলাফল নির্ভর করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠী, অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এবং সংঘাত কতটা দীর্ঘায়িত হয় তার ওপর। এর পাশাপাশি যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবও যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর পড়ছে।
ট্রাম্প বলেছেন, সংঘাত নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর অথবা তার আগেই শেষ হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানকে হয় গ্রহণযোগ্য ও বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত নিতে হবে, নয়তো পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। ফলে তাঁর বক্তব্যে একদিকে সামরিক জয়ের আত্মবিশ্বাস, অন্যদিকে আলোচনার জন্য চাপ দুই ধরনের বার্তাই রয়েছে।




