মাত্র আট ঘণ্টায় মহাকাশ স্টেশনে চার নভোচারী, গড়ল যুক্তরাষ্ট্রের নতুন গতি রেকর্ড

মাত্র আট ঘণ্টায় মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছে গতি রেকর্ড গড়েছে চার নভোচারীর দল, যাদের একজনের স্ত্রী নভেম্বরে তৃতীয় সন্তানের জন্ম দেবেন।

মাত্র আট ঘণ্টায় মহাকাশ স্টেশনে চার নভোচারী, গড়ল যুক্তরাষ্ট্রের নতুন গতি রেকর্ড

মাত্র আট ঘণ্টায় মহাকাশ স্টেশনে চার নভোচারী, গড়ল যুক্তরাষ্ট্রের নতুন গতি রেকর্ড


১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সকালে ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল মহাকাশঘাঁটির উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে চার নভোচারীকে নিয়ে রকেটটি আকাশে ওঠে। স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ১০ মিনিটে শুরু হয় এই ঐতিহাসিক যাত্রা। প্রায় আট ঘণ্টারও কম সময়ে তাঁদের বহনকারী মহাকাশযান আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত হয়। মহাকাশ সংস্থা জানিয়েছে, স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৫ মিনিটে সংযোগ সম্পন্ন হয়। উৎক্ষেপণ থেকে সংযোগ পর্যন্ত সময় ছিল ৭ ঘণ্টা ৫৫ মিনিট। 

এই অভিযানে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের দুই নভোচারী জেসিকা ওয়াটকিনস ও লুক ডেলানি, কানাডার মহাকাশচারী জশুয়া কুটরিক এবং রাশিয়ার মহাকাশচারী সের্গেই তেতেরিয়াতনিকভ। চারজনই দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা অভিযানের অংশ হিসেবে প্রায় ছয় মাস আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে অবস্থান করবেন। 

এই দলের নেতৃত্বে রয়েছেন জেসিকা ওয়াটকিনস। তাঁর জন্যও এবারের অভিযান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি এর আগে ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেছিলেন। এবারের অভিযানে তিনি কক্ষপথে একটি দলের নেতৃত্ব দেওয়া প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী হিসেবে নতুন একটি ইতিহাস তৈরি করেছেন। মহাকাশ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এটি তাঁর দ্বিতীয় মহাকাশযাত্রা। 

অভিযানের আরেক সদস্য লুক ডেলানির জন্য এটি প্রথম মহাকাশযাত্রা। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক নৌবাহিনীর বৈমানিক এবং পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কানাডার জশুয়া কুটরিকও প্রথমবারের মতো মহাকাশে গেলেন। তিনি কানাডার রাজকীয় বিমানবাহিনীর কর্নেল এবং তাঁর প্রথম মহাকাশ অভিযান হিসেবে এবারের যাত্রা শুরু করেছেন। রাশিয়ার সের্গেই তেতেরিয়াতনিকভের জন্যও এটি প্রথম মহাকাশযাত্রা। 

তবে এই অভিযানের সবচেয়ে আবেগঘন বিষয়গুলোর একটি হলো কানাডার জশুয়া কুটরিকের পারিবারিক পরিস্থিতি। তিনি যখন মহাকাশ স্টেশনে প্রায় ছয় মাসের দায়িত্ব পালন করবেন, তখন তাঁর স্ত্রী হিদার তাঁদের তৃতীয় সন্তানের জন্ম দেবেন। শিশুটির জন্ম নভেম্বরের শেষ দিকে হওয়ার কথা রয়েছে। অর্থাৎ পৃথিবী থেকে শত শত কিলোমিটার ওপরে অবস্থান করার সময়ই কুটরিক বাবা হওয়ার খবর পাবেন। 

কানাডার মহাকাশ সংস্থা জানিয়েছে, কুটরিকের পরিবারকে এই সময় প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে। তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থার ব্যবস্থাপক ডানা ওয়েইগেলও জানিয়েছেন, ছয় মাসের এই অভিযানের সময় জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটতে পারে। তাই কুটরিক যাতে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন না হন, সে বিষয়ে সহযোগিতা করা হবে। 

মহাকাশে অবস্থানরত কোনো নভোচারীর পরিবারে সন্তানের জন্মের ঘটনা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। এর আগে ২০০৪ সালে নভোচারী মাইক ফিনকের স্ত্রী যখন তাঁদের কন্যাসন্তানের জন্ম দেন, তখন মহাকাশ সংস্থা মহাকাশ স্টেশন থেকে চিকিৎসাকেন্দ্রে যোগাযোগের ব্যবস্থা করেছিল। ২০০৯ সালেও নভোচারী র‍্যান্ডি ব্রেসনিক কক্ষপথ থেকে তাঁর স্ত্রীর হাসপাতালে যোগাযোগ করতে পেরেছিলেন। ফলে কুটরিকের ক্ষেত্রেও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার সম্ভাবনা রয়েছে। 

তবে কুটরিকের বর্তমান পরিস্থিতি আরও বিশেষ, কারণ তাঁর সন্তান জন্ম নেওয়ার সময় তিনি পৃথিবীর বাইরে থাকবেন এবং প্রায় ছয় মাসের পুরো অভিযানে অংশ নেবেন। কানাডার মহাকাশ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তাঁর এই অভিযান স্বাস্থ্য গবেষণা, মানবদেহের পরিবর্তন, শারীরিক সক্ষমতা, হাড়ের ঘনত্ব, হৃদ্‌যন্ত্র ও শ্বাসপ্রশ্বাসের কার্যক্রমসহ বিভিন্ন গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। 

নতুন এই অভিযানের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো অল্প সময়ে মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছে যাওয়া। সাধারণভাবে মহাকাশ স্টেশনে যাওয়ার সময় বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। এর মধ্যে মহাকাশ স্টেশনের কক্ষপথ, পৃথিবীর অবস্থান, উৎক্ষেপণের সময়, মহাকাশযানের গতিপথ এবং সংযোগের জন্য প্রয়োজনীয় সঠিক অবস্থান অন্যতম। এবার মহাকাশ স্টেশন উৎক্ষেপণস্থলের তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকায় দ্রুত সংযোগ স্থাপন সম্ভব হয়েছে। 

মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণের পর নির্দিষ্ট কক্ষপথে প্রবেশ করে। এরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে একাধিক ধাপে অবস্থান পরিবর্তন করে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের দিকে এগিয়ে যায়। মহাকাশ সংস্থা জানিয়েছে, পুরো যাত্রাপথে মহাকাশযানের স্বয়ংক্রিয় গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়। পৃথিবীতে থাকা নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র থেকেও পুরো প্রক্রিয়া নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। 

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছানোর পর চার নভোচারী প্রথমে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর মহাকাশযান এবং স্টেশনের ভেতরের চাপ ও অন্যান্য বিষয় পরীক্ষা করে প্রবেশের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। চার নভোচারী পরে স্টেশনের ভেতরে প্রবেশ করেন এবং সেখানে থাকা অন্য নভোচারীদের সঙ্গে যোগ দেন। 

এই নতুন দল সেখানে থাকা আগের দলের দায়িত্ব ধীরে ধীরে গ্রহণ করবে। তাঁদের অবস্থানের সময় আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালিত হবে। এর মধ্যে মানুষের শরীরের ওপর মহাকাশের ক্ষুদ্র মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব, রক্তপ্রবাহের পরিবর্তন, রোগ নির্ণয় এবং উদ্ভিদ উৎপাদন নিয়ে গবেষণা রয়েছে। 

বিশেষভাবে মানুষের কোষ থেকে তৈরি টিস্যু নিয়ে গবেষণার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসা, বিভিন্ন রোগের কারণ বোঝা এবং ওষুধ পরীক্ষার নতুন পদ্ধতি উন্নয়নের সম্ভাবনা রয়েছে। হৃদ্‌রোগ ও পারকিনসন রোগের মতো জটিল অসুস্থতার গবেষণাতেও এই ধরনের কাজ ভবিষ্যতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মহাকাশ সংস্থার তথ্য থেকে জানা যায়। 

উদ্ভিদ উৎপাদন নিয়েও নতুন পরীক্ষা চালানো হবে। মহাকাশে দীর্ঘদিন মানুষের বসবাসের ক্ষেত্রে খাদ্য উৎপাদন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই কম মাধ্যাকর্ষণের পরিবেশে কীভাবে উদ্ভিদ বেড়ে ওঠে, কীভাবে সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে উদ্ভিদ উৎপাদন করা যায় এবং ভবিষ্যতের দীর্ঘ মহাকাশ অভিযানে এ ধরনের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হতে পারে, তা নিয়ে গবেষণা চলবে। 

এই অভিযান শুধু গবেষণার দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশযাত্রার ধারাবাহিকতার ক্ষেত্রেও তা উল্লেখযোগ্য। এটি মহাকাশ সংস্থার জন্য মহাকাশ স্টেশনে পাঠানো ত্রয়োদশ দীর্ঘমেয়াদি মানববাহী অভিযান। ২০২০ সালের পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন বাদ দিলে এটি ওই ব্যবস্থার ত্রয়োদশ মানববাহী দল পাঠানোর অভিযান। 

অভিযানের নামও ত্রয়োদশ হওয়ায় দলটি ১৯৭০ সালের অ্যাপোলো তেরো অভিযানের স্মরণে বিভিন্ন প্রতীক ব্যবহার করেছে। সেই ঐতিহাসিক অভিযানে চাঁদের পথে যাওয়া মহাকাশযানে গুরুতর সমস্যা দেখা দিয়েছিল, কিন্তু নভোচারীরা নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসেন। এবারের দলও সেই অভিযানের সাহস ও সংকল্পকে স্মরণ করেছে। 

উৎক্ষেপণের আগে চার নভোচারীকে বহনকারী যানটির জ্বালানি ব্যবস্থায় ত্রুটি ধরা পড়ায় অভিযানটি প্রায় তিন সপ্তাহ পিছিয়ে যায়। মহাকাশযানের জ্বালানি ব্যবস্থায় দেখা দেওয়া সমস্যার সমাধান ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা শেষে নতুন করে উৎক্ষেপণের অনুমতি দেওয়া হয়। উৎক্ষেপণের দিন সকালেও ঘন মেঘের কারণে আবহাওয়া নিয়ে উদ্বেগ ছিল। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি অনুকূলে আসায় নির্ধারিত সময়ের কাছাকাছি উৎক্ষেপণ সম্ভব হয়। 

উৎক্ষেপণের সময় ব্যবহৃত রকেটের প্রথম ধাপ সফলভাবে আলাদা হওয়ার পর সেটি পৃথিবীতে ফিরে আসার জন্য নির্ধারিত পথে যায়। অন্যদিকে নভোচারীদের বহনকারী মহাকাশযান নিজস্ব যাত্রা অব্যাহত রাখে। এই পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট ব্যবস্থার কারণে একই ধরনের মহাকাশ অভিযান তুলনামূলকভাবে ঘন ঘন পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে। 

মহাকাশ স্টেশন পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার উচ্চতায় পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে। সেখানে অবস্থানরত নভোচারীরা এক দিনে বহুবার পৃথিবীর চারপাশে ঘোরেন। পৃথিবীর মাটিতে থাকা পরিবার, সহকর্মী এবং মানুষের কাছে এটি অবিশ্বাস্য দূরত্ব হলেও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে মহাকাশচারীরা নিয়মিত পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারেন।

কুটরিকের জন্য এবারের অভিযান তাই একই সঙ্গে বৈজ্ঞানিক দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত আবেগের বড় পরীক্ষা। পৃথিবী থেকে দূরে অবস্থান করে তিনি যখন নতুন সন্তানের জন্মের খবরের অপেক্ষায় থাকবেন, তখন তাঁর পরিবারও পৃথিবীতে বসে মহাকাশে থাকা একজন স্বজনের সঙ্গে সেই আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার অপেক্ষায় থাকবে। মহাকাশ সংস্থার পক্ষ থেকে যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। 

সব মিলিয়ে, ১ অক্টোবরের এই অভিযান একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছানোর সময়ের নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে, অন্যদিকে চার নভোচারীর মধ্যে তিনজনের জন্য প্রথম মহাকাশযাত্রার সূচনা করেছে। আর কানাডার জশুয়া কুটরিকের জন্য এটি হয়ে উঠেছে আরও ব্যক্তিগত একটি অধ্যায়, কারণ পৃথিবী থেকে দূরে অবস্থান করেই তিনি তাঁর তৃতীয় সন্তানের জন্মের অপেক্ষা করবেন। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর