দিন ও রাতের সমান দৈর্ঘ্যে আজ বিশ্বজুড়ে জলবিষুব বা ইকুইনক্সের আগমন ঘটে

আজ ২৩ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে দিন ও রাতের সময়সীমা সমান থাকায় উভয় গোলার্ধে ঋতু পরিবর্তনের এক অনন্য বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে।

দিন ও রাতের সমান দৈর্ঘ্যে আজ বিশ্বজুড়ে জলবিষুব বা ইকুইনক্সের আগমন ঘটে

দিন ও রাতের সমান দৈর্ঘ্যে আজ বিশ্বজুড়ে জলবিষুব বা ইকুইনক্সের আগমন ঘটে


আজ ২৩ সেপ্টেম্বর পৃথিবীর জন্য একটি বিশেষ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ দিন। সাধারণ দিনগুলোর মতো আজও চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানেই পুরো একটি দিন গঠিত হচ্ছে। তবে প্রকৃতির নিয়মে আজকের দিনে ঘটছে এক চমৎকার ভৌগোলিক পরিবর্তন। বিশ্বের প্রায় সর্বত্রই আজকের দিন ও রাতের দৈর্ঘ্য একেবারে কাছাকাছি বা সমান হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ উত্তর থেকে দক্ষিণ—পৃথিবীর উভয় গোলার্ধের মানুষই আজ প্রায় ১২ ঘণ্টা সূর্যের আলো পাবেন এবং বাকি ১২ ঘণ্টা কাটাতে চলেছেন অন্ধকারের সান্নিধ্যে। বিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় প্রকৃতির এই বিরল ও অপরূপ ভারসাম্যপূর্ণ সাম্যাবস্থাকে বলা হয় ‘বিষুব’।  


আমাদের গ্রহ পৃথিবী তার অক্ষ বা মেরুরেখায় চিরকাল কিছুটা হেলে মহাকাশে নিজের কক্ষপথে সূর্যকে পরিক্রমণ করে। এই হেলানো অবস্থানের কারণেই বছরজুড়ে বিভিন্ন ঋতুতে দিন বড় এবং রাত ছোট হয় কিংবা রাত বড় হয়ে দিন ছোট রূপ নেয়। উত্তর গোলার্ধে যখন গ্রীষ্মকাল থাকে, তখন সূর্য সেদিকে বেশি হেলে থাকে, ফলে দিন দীর্ঘতর হয়। আবার যখন শীতকাল আসে, তখন উত্তর গোলার্ধ সূর্য থেকে দূরে সরে যায় এবং রাত বড় হয়ে যায়। তবে সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরে চলার সময় বছরে এমন দুটি বিশেষ মুহূর্ত আসে, যখন পৃথিবী তার হেলে থাকা অক্ষে অবস্থান নেওয়া সত্ত্বেও পৃথিবীর বিষুবরেখা ঠিক সরাসরি সূর্যের মুখোমুখি দাঁড়ায়। এই মহাজাগতিক সময়ে সূর্যের আলো সমানভাবে উত্তর ও দক্ষিণ উভয় গোলার্ধে এসে পড়ে। ফলে কোনো একটি নির্দিষ্ট গোলার্ধের দিকে সূর্যের বাড়তি ঝুঁকি থাকে না। এই দুটি বিশেষ দিনের একটি হলো মার্চের ২১ তারিখ, যাকে বসন্ত বিষুব বা বাসন্তী বিষুব বলা হয়ে থাকে। আর দ্বিতীয় দিনটি হলো সেপ্টেম্বরের ২৩ তারিখ, যা পরিচিত জলবিষুব বা শারদীয় বিষুব নামে।  
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের এই বিষুবটি পৃথিবীর জলবায়ু ও ঋতুচক্রে এক বিরাট পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে আনে। আজ থেকে উত্তর গোলার্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে শরৎকালের প্রভাব গাঢ় হতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে দিন ছোট হতে থেকে রাতের ব্যাপ্তি বাড়তে শুরু করে। অপরদিকে ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যায় পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধে। সেখানে আজকের পর থেকে বসন্তের মিষ্টি আবহাওয়া শুরু হয় এবং রাতের অন্ধকার কাটিয়ে দিনের আলোর ব্যাপ্তি ক্রমে দীর্ঘ হতে থাকে। পৃথিবীর এই চিরন্তন গতিশীলতা মানব সভ্যতার শুরু থেকেই কৃষি, প্রকৃতি এবং মানব জীবনের দৈনন্দিন সূচিতে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে এসেছে। প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন দেশের মানুষ এই বিশেষ দিনটিকে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার প্রতীক হিসেবে আনন্দ-উৎসবের মাধ্যমে উদযাপন করত।


আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে ঘড়ির সময় আমরা অনুসরণ করি, তাতে সবসময় সমান চব্বিশ ঘণ্টা হিসাব করা হলেও আকাশে সূর্যের অবস্থান প্রতিদিন একইভাবে থাকে না। গ্রীষ্মের প্রখর রোদের দীর্ঘ দিন শেষে কিংবা কনকনে শীতের দীর্ঘ রাতের পর যখন দিন ও রাত সমান ১২ ঘণ্টার ব্যালেন্স বা ভারসাম্যে ফিরে আসে, তখন তা প্রকৃতির এক অদ্ভুত সৌন্দর্যকেই প্রকাশ করে। এই দিনে বিশ্বের প্রতিটি ভৌগোলিক স্থা‌নেই সূর্য ঠিক পূর্ব দিকে উদিত হয় এবং ঠিক পশ্চিম দিকে অস্ত যায়, যা বছরের অন্যান্য দিনে কিছুটা কোণাকুণি বা বাঁকাভাবে ঘটে থাকে। ফলে যেকোনো মানমন্দির বা প্রাচীন ভৌগোলিক স্থাপনাগুলোতে আজকের দিনে সূর্যের ছায়াকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করা হয়।


বিজ্ঞানীরা অবশ্য ব্যাখ্যা করেন যে নিখুঁত গাণিতিক পরিমাপে বায়ুমণ্ডলের আলোর প্রতিসরণ এবং সূর্যের আয়তনের কারণে আলো পাওয়ার ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম কয়েক মিনিটের তফাত ঘটতে পারে। বায়ুমণ্ডলের ঘন স্তরের মধ্য দিয়ে সূর্যের আলো বেঁকে আসার কারণে সূর্যোদয় কিছুটা আগেই আমাদের চোখে পড়ে এবং সূর্যাস্তের পরও কিছুটা সময় আলোর আভা বাতাসে থেকে যায়। তা সত্ত্বেও ভৌগোলিক সংজ্ঞায় এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের নিয়মে আজকের এই ২৩ সেপ্টেম্বর দিনটিকে বিশ্বজুড়ে সমান দিন ও রাতের দিন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। প্রকৃতি ও মহাবিশ্বের স্বাভাবিক নিয়মে আজকের পর থেকে পৃথিবী তার উত্তর অংশে শীতের দিকে এবং দক্ষিণ অংশে গরমের দিকে এক পা এক পা করে এগিয়ে যাবে। ঋতু পরিবর্তনের এই নিরন্তর চক্র পৃথিবীর প্রতিটি জীবন ও প্রকৃতির প্রাণশক্তিকে সতেজ ও গতিশীল রাখতে প্রতিনিয়ত নতুন বার্তা পৌঁছে দেয়।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর