বিপর্যয়ের শঙ্কায় এআই নেতাদের সতর্কতা, তবু গতি কমাতে নারাজ যুক্তরাষ্ট্র ও চীন
বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে এআই উন্নয়ন ধীর করার আহ্বান প্রযুক্তি নেতাদের, তবে বৈশ্বিক আধিপত্যের প্রতিযোগিতায় গতি কমাতে নারাজ যুক্তরাষ্ট্র ও চীন।
বিপর্যয়ের শঙ্কায় এআই নেতাদের সতর্কতা, তবু গতি কমাতে নারাজ যুক্তরাষ্ট্র ও চীন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি মানবজাতির জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—এমন সতর্কতা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তিবিদ ও এআই গবেষকদের মধ্যে। কিন্তু এআই খাতে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় থাকা দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এখন পর্যন্ত উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বানে সাড়া দেওয়ার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই বৈপরীত্য তুলে ধরা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই অত্যাধুনিক বা ‘ফ্রন্টিয়ার’ এআই মডেলের উন্নয়নের গতি নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর এই অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান ও ইলন মাস্কসহ প্রযুক্তি খাতের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাদের উদ্বেগের মূল জায়গা হলো—এআইয়ের সক্ষমতা যে গতিতে বাড়ছে, সেই গতিতে নিরাপত্তাব্যবস্থা ও মানুষের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা এগোতে পারছে কি না।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক এআইয়ের মাধ্যমে শক্তিশালী সাইবার হামলা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে—এমন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার সম্ভাবনা। তবে এসব ঝুঁকির মাত্রা ও সম্ভাবনা নিয়ে এআই গবেষক ও প্রযুক্তি খাতের মধ্যে ঐকমত্য নেই। এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং ও মেটার মার্ক জাকারবার্গের মতো প্রভাবশালী প্রযুক্তি নেতারা কঠোর বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ বা উন্নয়ন ধীর করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এআই প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ট্রাম্পের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে চীনের চেয়ে এগিয়ে থাকার বিষয়টি। এ কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে এআই উন্নয়নের গতি কমানোর প্রস্তাবকে ওয়াশিংটন এমনভাবে দেখছে, যা বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল করতে পারে।
চীনও এআই উন্নয়নের গতি কমানোর প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি নেতাদের কিছু সতর্কতাকে ‘থ্রেট ন্যারেটিভ’ বা হুমকির বয়ান এবং প্রতিযোগিতামূলক কৌশলের অংশ হিসেবে সমালোচনা করা হয়েছে। চীনের উদ্বেগ হলো, ‘এআই নিরাপত্তা’র যুক্তি ব্যবহার করে দেশটির উন্নত চিপ, কম্পিউটিং সক্ষমতা ও বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ আরও সীমিত করা হতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পুরোপুরি আলোচনা থেকে সরে যাচ্ছে না। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে এআই নিয়ে একটি সংলাপব্যবস্থা এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে এমন গুরুতর এআই ঘটনার ক্ষেত্রে পারস্পরিক তথ্য জানানোর ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সাইবার হামলা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর আক্রমণ কিংবা বড় ধরনের এআই ব্যর্থতার মতো বিষয়ে দুই দেশের কিছু অভিন্ন উদ্বেগ রয়েছে।
মূল সমস্যা হচ্ছে পারস্পরিক অবিশ্বাস। যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা, তারা একতরফাভাবে এআইয়ের গতি কমালে চীন প্রযুক্তিগত ব্যবধান কমিয়ে ফেলতে পারে। বিপরীতে চীনের আশঙ্কা, নিরাপত্তার নামে নেওয়া আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত দেশটির প্রযুক্তিগত উত্থান ঠেকানোর হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। ফলে নিরাপত্তার প্রশ্নে কিছু অভিন্ন স্বার্থ থাকলেও কৌশলগত প্রতিযোগিতা বড় ধরনের সমঝোতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটন বৈঠকে এআই নিরাপত্তা আলোচনায় থাকার কথা। তবে বর্তমান অবস্থান অনুযায়ী, এআই উন্নয়নের গতি কমানোর মতো বড় কোনো যৌথ সিদ্ধান্তের পরিবর্তে তথ্য বিনিময়, জরুরি যোগাযোগ এবং নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় সীমিত সহযোগিতাই আলোচনার বাস্তবসম্মত ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।