হিমালয়ে দ্রুত গলছে হিমবাহ, বাড়ছে ৮ দেশের বন্যাঝুঁকি
জলবায়ু পরিবর্তনে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলছে, বাড়ছে হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণ ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি। প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশসহ হিমালয়-নির্ভর আট দেশের নদী অববাহিকায়।
হিমালয়ে দ্রুত গলছে হিমবাহ, বাড়ছে ৮ দেশের বন্যাঝুঁকি
হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে। এর ফলে হিমবাহ-হ্রদ বড় হয়ে ওঠা, আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোতে হিন্দুকুশ–হিমালয় অঞ্চলের দ্রুত পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এই বিস্তৃত পর্বতাঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, চীন, আফগানিস্তান ও মিয়ানমারের নদী ও ভূপ্রকৃতিগত গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন সংস্থা আইসিআইএমওডির ২০২৬ সালের গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হিন্দুকুশ–হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহের মোট আয়তন প্রায় ১২ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে বরফের মজুতও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০০০ সালের পর হিমবাহ থেকে বরফ হারানোর গতি আরও দ্রুত হয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে এই পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।
হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে পাহাড়ি এলাকায় নতুন নতুন হিমবাহ-হ্রদ তৈরি হতে পারে, আবার পুরোনো হ্রদও আকারে বড় হতে পারে। এসব হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ বরফ, পাথর বা মাটির কারণে দুর্বল হয়ে ভেঙে গেলে বিপুল পরিমাণ পানি হঠাৎ নিচের দিকে নেমে আসতে পারে। এ ধরনের ঘটনাকে হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা বলা হয়। এমন বন্যা পাহাড়ি জনবসতি, সড়ক, সেতু, জলবিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে।
২০২৬ সালের আগস্টে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ও পাথরধসের পর ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার ঘটনাও হিমালয় অঞ্চলের ঝুঁকিকে নতুন করে সামনে এনেছে। বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়নের কারণে হিমবাহ পাতলা হওয়া এবং পাহাড়ি ঢালের স্থিতিশীলতা কমে যাওয়ার মতো বিষয় এ ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে কোনো একটি ঘটনার একমাত্র কারণ জলবায়ু পরিবর্তন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়; ভূতাত্ত্বিক ও স্থানীয় অন্যান্য কারণও ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশ সরাসরি হিমবাহ অঞ্চলে অবস্থিত না হলেও হিমালয় ও এর আশপাশের উজান অঞ্চল থেকে আসা নদীগুলোর নিম্ন অববাহিকায় দেশটির অবস্থান। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ নদী ব্যবস্থার প্রবাহের ওপর উজানের বৃষ্টি, তুষার ও হিমবাহের পরিবর্তনের প্রভাব রয়েছে। ফলে হিমালয় অঞ্চলে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা বা নদীর প্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে তার প্রভাব বাংলাদেশের নদী ও নিম্নাঞ্চলেও পড়তে পারে।
তবে বাংলাদেশসহ আট দেশের জন্য বর্তমানে কোনো নির্দিষ্ট ‘তাৎক্ষণিক ভয়াবহ সতর্কবার্তা’ জারি হয়েছে—এমন তথ্য নিশ্চিত নয়। বরং গবেষণাগুলো দীর্ঘমেয়াদে হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি বাড়ার বিষয়ে সতর্ক করছে। তাই হিমবাহ ও হিমবাহ-হ্রদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, আধুনিক আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে তথ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর বিশেষজ্ঞরা গুরুত্ব দিচ্ছেন।