ককটেল-আগুনে উত্তপ্ত ঢাকা, পুড়ছে বাস নেপথ্যে কারা, রাজনৈতিক দায় কার?
দুই দিনে ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুনে উত্তপ্ত ঢাকা, আহত চালক; সিসিটিভি ফুটেজ ধরে নেপথ্যের জড়িতদের খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ককটেল-আগুনে উত্তপ্ত ঢাকা, পুড়ছে বাস নেপথ্যে কারা, রাজনৈতিক দায় কার?
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পরপর দুই দিন ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুনের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শুক্রবারের একাধিক বিস্ফোরণ ও বাসে আগুনের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় মিরপুর, পল্লবী ও মধ্যবাড্ডায় তিনটি বাসে আগুনের ঘটনা সামনে এসেছে। একই সন্ধ্যায় যাত্রাবাড়ীতে পরপর চারটি ককটেল বিস্ফোরণে একজন রিকশাচালক আহত হয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, পৃথক ঘটনাগুলোর তদন্ত চলছে। ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। রাজধানীজুড়ে তল্লাশি, টহল ও নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।
শনিবার সন্ধ্যার প্রথম দিকেই মিরপুরের দুটি এলাকায় বাসে আগুনের খবর আসে। সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে মিরপুর-১ নম্বর এলাকায় অভিজাত পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে। মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাফিজুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, বাসটির একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডে রূপ নেওয়ার আগেই আগুন নেভানো সম্ভব হয়। এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
প্রায় একই সময়ে মিরপুর-১১ নম্বরের জমজম টাওয়ারের বিপরীত পাশে শিকড় পরিবহনের একটি বাসে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিস সন্ধ্যা ৭টা ১৩ মিনিটের দিকে খবর পেয়ে দুটি ইউনিট পাঠিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। বাসটিতে তখন যাত্রী ছিলেন না বলে পুলিশের একটি বক্তব্যে জানানো হয়েছে।
তবে মিরপুর-১১-এর বাসটির আগুন কীভাবে লেগেছে, সে বিষয়ে প্রকাশিত তথ্যে কিছু অসঙ্গতি রয়েছে। আজকের পত্রিকার প্রতিবেদনে ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে আগুনের কারণ জানা যায়নি; পুলিশ অগ্নিসংযোগের সম্ভাবনা তদন্ত করছে। অন্যদিকে জাগো নিউজের প্রতিবেদনে ফায়ার সার্ভিসের বরাতে যান্ত্রিক ত্রুটির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ওই নির্দিষ্ট ঘটনাকে নিশ্চিতভাবে পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগ বলা সতর্কতার দাবি রাখে।
এরপর মধ্যবাড্ডায় আরেকটি বাসে আগুনের ঘটনা ঘটে। রাত ৮টার কাছাকাছি সময়ে কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের বিপরীত পাশে পার্কিং করে রাখা একটি বাসে আগুন লাগে। স্থানীয় দোকানি, পথচারী ও পুলিশ সদস্যরা আগুন নেভাতে এগিয়ে আসেন। বাসটির কয়েকটি আসন পুড়ে যায়। বাড্ডা থানার পুলিশ জানিয়েছে, কীভাবে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে তা তদন্ত করা হচ্ছে। বাসে আগুনের পাশাপাশি শনিবার সন্ধ্যায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনাগুলোর একটি ঘটে যাত্রাবাড়ীতে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, যাত্রাবাড়ী থানার বিপরীতে সামাদ সুপার মার্কেটের সামনে পরপর চারটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। এতে বিল্লাল নামে ৩২ বছর বয়সী এক রিকশাচালক আহত হন। তাঁকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ওপর থেকে—সম্ভবত ফ্লাইওভার এলাকা থেকে—ককটেলগুলো নিক্ষেপ করা হয়ে থাকতে পারে। তবে কারা এগুলো নিক্ষেপ করেছে, তাৎক্ষণিকভাবে তা নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। শনিবারের ঘটনাগুলো আরও গুরুত্ব পাচ্ছে কারণ এর মাত্র এক দিন আগেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিকভাবে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত যাত্রাবাড়ী, মালিবাগ, আগারগাঁও, মহাখালীসহ রাজধানীর একাধিক স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। বাংলা ট্রিবিউনের হিসাবে অন্তত নয়টি স্থানে বিস্ফোরণ এবং দুটি বাসে আগুনের ঘটনা ঘটে। যাত্রাবাড়ীতে কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণে ইবাদুর রহমান নামে একজন অটোরিকশাচালক আহত হন। শুক্রবার রাতের এসব ঘটনার পর শনিবার সকাল থেকেই রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার করে ঢাকা মহানগর পুলিশ।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বাসস জানিয়েছে, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও প্রবেশপথে দুই শতাধিক চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। ফ্লাইওভারের প্রবেশ ও বের হওয়ার স্থানগুলোতেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ইউনিফর্মধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকের সদস্যদেরও বিভিন্ন এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে।
পুলিশের পাশাপাশি স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের সদস্যরাও বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে তল্লাশিচৌকি ও টহল কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সন্দেহজনক ব্যক্তি ও যানবাহনে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
বিশেষ করে মোটরসাইকেলসহ সন্দেহজনক যানবাহনের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পুলিশের উদ্দেশ্য হচ্ছে বিস্ফোরক বহন, আকস্মিক হামলা কিংবা অন্য কোনো অপরাধমূলক তৎপরতা ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করা। তবে এত নিরাপত্তার মধ্যেও শনিবার সন্ধ্যায় আবার বাসে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণ ও বাসে আগুনের প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের পাশাপাশি প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—কারা এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে এবং এর পেছনে কোনো সংগঠিত পরিকল্পনা রয়েছে কি না।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও ঘটনা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠছে। তবে শনিবার রাত পর্যন্ত পাওয়া প্রকাশ্য ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে সব ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুনের ঘটনাকে বিএনপি, আওয়ামী লীগ কিংবা অন্য কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নির্দেশে সংঘটিত বলে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
কিছু ঘটনায় পুলিশ সন্দেহভাজনদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বক্তব্য দিয়েছে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষও একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক অভিযোগ এবং তদন্তে প্রমাণিত অপরাধের দায় একই বিষয় নয়।
বিশেষ করে শনিবারের তিনটি বাসের ঘটনার মধ্যে অন্তত একটি বাসের আগুনের কারণ নিয়েই বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে সব ঘটনাকে একই সূত্রে গাঁথা পরিকল্পিত রাজনৈতিক সহিংসতা হিসেবে উপস্থাপন করাও যথাযথ হবে না।
অন্যদিকে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার দিক থেকে ঘটনাগুলো গুরুতর। জনবহুল এলাকায় ককটেল নিক্ষেপ কিংবা গণপরিবহনে আগুন দেওয়া হলে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে যাত্রী, চালক, পথচারী ও পরিবহন শ্রমিকদের জীবন সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
গত দুই দিনের ঘটনাতেই অন্তত দুজন পরিবহনচালক আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। শুক্রবার যাত্রাবাড়ীর বিস্ফোরণে একজন অটোরিকশাচালক আহত হওয়ার পর শনিবার একই এলাকায় আবার বিস্ফোরণে আরেকজন রিকশাচালক আহত হন। এ অবস্থায় পুলিশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে শুধু নিরাপত্তা চৌকি বাড়ানো নয়, বরং দ্রুত হামলাকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না সেটি বের করা।
ডিএমপির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজধানীতে বাড়তি নিরাপত্তা, চেকপোস্ট, টহল ও নজরদারি অব্যাহত থাকবে। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। পরপর দুই দিনের বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড তাই এখন শুধু বিচ্ছিন্ন কয়েকটি অপরাধের তদন্তে সীমাবদ্ধ নেই। রাজধানীর নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের নির্বিঘ্ন চলাচলের প্রশ্নও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
কে বা কারা এসব ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে—সেটি তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার আগেই কোনো রাজনৈতিক দলকে সামগ্রিকভাবে দায়ী করা তথ্যগতভাবে সঠিক হবে না। পুলিশের তদন্ত, গ্রেপ্তার, উদ্ধার হওয়া আলামত এবং পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া থেকেই পৃথক ঘটনাগুলোর দায় সম্পর্কে পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যাবে।