পাকিস্তানের বৃত্তি নিয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নতুন অভিযোগ
পাকিস্তানের পূর্ণ অর্থায়িত বৃত্তি নিয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ঘোষিত সুবিধা না পাওয়ায় পড়াশোনা ও খরচ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
পাকিস্তানের বৃত্তি নিয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নতুন অভিযোগ
পাকিস্তান সরকারের দেওয়া পূর্ণ অর্থায়িত বৃত্তি নিয়ে বিপাকে পড়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। তাদের দাবি, আবেদন ও বাছাই প্রক্রিয়ার সময় টিউশন ফি, আবাসন, মাসিক ভাতা, বিমানভাড়া ও অন্যান্য সুবিধার কথা জানানো হলেও চূড়ান্ত প্রস্তাবপত্রে এসব সুবিধার সবগুলো উল্লেখ নেই। ফলে পাকিস্তানে পড়তে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।
তবে বিষয়টি যাচাই করে দেখা গেছে, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য পাকিস্তানের বৃত্তি কর্মসূচিটি বাস্তব এবং পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কমিশন বা এইচইসির সরকারি ওয়েবসাইটে এটিকে ‘পূর্ণ অর্থায়িত’ বৃত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাকিস্তান-বাংলাদেশ নলেজ করিডোরের আওতায় পাঁচ বছরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ৫০০টি ‘আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল বৃত্তি’ দেওয়ার ঘোষণা রয়েছে।
পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কমিশনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বৃত্তির আওতায় টিউশন ফি, জীবনযাপন ভাতা, বই ও স্টেশনারি সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক যাতায়াতের সুবিধা রয়েছে। সরকারি বৃত্তি পৃষ্ঠায় আবাসন ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সুবিধার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এই কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। আবেদনকারীদের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবেদন, বৃত্তি পরীক্ষা ও সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে বাছাই করা হয়। ২০২৬ সালের আবেদন প্রক্রিয়াতেও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আবেদন নেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কমিশন ২০২৬ সালের মে মাসে জানায়, বাংলাদেশে আয়োজিত শিক্ষা প্রদর্শনীর মাধ্যমে দেশটির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে ৫০০টি পূর্ণ অর্থায়িত আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল বৃত্তির কথাও পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
এর আগে পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কমিশন জানিয়েছিল, প্রথম ধাপে ৭৪ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পাকিস্তানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। পরবর্তী ধাপে প্রায় ২৫০ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
তবে বিতর্ক তৈরি হয়েছে দ্বিতীয় ধাপের কয়েকজন মাস্টার্স শিক্ষার্থীর অভিযোগকে কেন্দ্র করে। তাদের দাবি, দীর্ঘ আবেদন, পরীক্ষা ও যাচাই-বাছাই শেষে পাওয়া প্রস্তাবপত্রে সরকারি প্রচারে উল্লেখ করা সব সুবিধা তারা পাচ্ছেন না। কয়েকজন শিক্ষার্থীর ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের প্রস্তাবপত্রে মূলত টিউশন ফি ও আবাসন সংক্রান্ত সুবিধার কথা রয়েছে; মাসিক ভাতা, খাবার, বিমানভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসাসহ অন্যান্য ব্যয়ের বিষয়ে স্পষ্টতা নেই।
শিক্ষার্থীরা আরও অভিযোগ করেছেন, তারা আবেদন করার সময় যে বিশ্ববিদ্যালয় বা বিষয় পছন্দ করেছিলেন, চূড়ান্ত পর্যায়ে সেই পছন্দের পরিবর্তন নিয়েও তারা সমস্যায় পড়েছেন। তাদের আশঙ্কা, মাসিক ভাতা ও অন্যান্য খরচ বহনের নিশ্চয়তা না থাকলে পাকিস্তানে গিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া অনেকের জন্য কঠিন হতে পারে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। পাকিস্তানের সরকারি বৃত্তি কর্মসূচি ভুয়া—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কমিশনের নিজস্ব ওয়েবসাইটে ৫০০টি পূর্ণ অর্থায়িত বৃত্তির ঘোষণা এবং বৃত্তির সুবিধাগুলো স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগও পুরোপুরি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ সরকারি ওয়েবসাইটে ঘোষিত সুবিধা এবং কয়েকজন শিক্ষার্থীর হাতে থাকা চূড়ান্ত প্রস্তাবপত্রে উল্লেখিত সুবিধার মধ্যে সত্যিই পার্থক্য থাকলে সেটি ব্যাখ্যা করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। বিশেষ করে কোন সুবিধা কোন পর্যায়ের শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং কখন থেকে তা কার্যকর হবে—এ বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বৃত্তি-সংক্রান্ত তালিকাতেও ২০২৬ সালের জুলাইয়ে পাকিস্তান সরকারের কর্মসূচির আওতায় পাকিস্তানের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিচ্ছু বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের তালিকা পাঠানোর বিষয়ে নথি প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ কর্মসূচিটির সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারি পর্যায়ের যোগাযোগও রয়েছে।
বর্তমানে যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে সবচেয়ে নির্ভুলভাবে বলা যায়—পাকিস্তানের বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য পূর্ণ অর্থায়িত বৃত্তি কর্মসূচি বাস্তব; তবে নির্বাচিত কয়েকজন শিক্ষার্থী ঘোষিত সুবিধা চূড়ান্ত প্রস্তাবপত্রে না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতে পুরো বৃত্তি কর্মসূচিকে ‘প্রতারণা’ বা ‘ভুয়া বৃত্তি’ হিসেবে চূড়ান্তভাবে আখ্যায়িত করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে তাই আবেদন বা বিদেশে যাওয়ার আগে পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কমিশনের সরকারি বিজ্ঞপ্তি, চূড়ান্ত প্রস্তাবপত্র এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি নথিতে কোন কোন সুবিধা লিখিতভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে—তা মিলিয়ে দেখা জরুরি। বিশেষ করে মাসিক ভাতা, আবাসন, খাবার, বিমানভাড়া, স্বাস্থ্যবিমা ও অন্যান্য ব্যয়ের দায়িত্ব কার—এসব বিষয়ে লিখিত নিশ্চয়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।