১৮৭০ সালের আইনের ফাঁদে আজকের আমেরিকা!
যখন কংগ্রেস ও ফেডারেল ট্রেড কমিশনের (FTC) মধ্যে অর্থায়ন সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, তখন তিনি মত দেন যে, অর্থ বরাদ্দ বিল পাস না হওয়া পর্যন্ত সংস্থার কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। পরে তিনি আরেকটি মত দেন, যেখানে জরুরি বা অপরিহার্য সেবা চালু রাখার অনুমতি দেওয়া হয়।
১৮৭০ সালের আইনের ফাঁদে আজকের আমেরিকা!
সরকারি অচলাবস্থা—যা ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দ্বিতীয় দীর্ঘতম হিসেবে চিহ্নিত—এর কোনো শেষ এখনো দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু এটি এখন দ্রুতই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য সরকারের উপর নতুনভাবে কর্তৃত্ব আরোপের একটি উপায়ে পরিণত হচ্ছে।
তবে শুরুটা এমন ছিল না। আসলে এটি শুরু হয়েছিল ওয়াশিংটনে ফেডারেল আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা থেকে।
অচলাবস্থার সূচনা
যুক্তরাষ্ট্রে আধুনিক অর্থে সরকারি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার (Shutdown) ধারা শুরু হয় ১৯৮০ সালে। সে সময় ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের অধীনে দায়িত্ব পালনকারী অ্যাটর্নি জেনারেল বেঞ্জামিন সিভিলেটি (Benjamin Civiletti) একাধিক আইনি মতামত দেন। তিনি ১৮৭০ সালের Antideficiency Act-এর একটি ধারাকে উদ্ধৃত করে বলেন, কংগ্রেসের অনুমোদনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সরকার কোনো অর্থ ব্যয় করতে পারবে না—আইনটি এ বিষয়ে “স্পষ্ট এবং অনির্দিষ্ট নয়।”
কিন্তু বর্তমান অচলাবস্থায় রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই তহবিল সংকটকে ব্যবহার করছেন ডেমোক্র্যাটদের শাস্তি দিতে, হাজারো ফেডারেল কর্মীকে ছাঁটাই করতে, এবং কংগ্রেসের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে নিজের অগ্রাধিকার অনুযায়ী ফেডারেল বাজেট পুনর্গঠন করতে। ফলে এই সংকট আরও জটিল হয়ে উঠছে এবং ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন কীভাবে তহবিল সংকট সামলাবে—তা নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হতে পারে।
কেন যুক্তরাষ্ট্রে ‘শাটডাউন’ হয়?
ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর আমেরিকান জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে সিভিলেটির ভূমিকা ছিল কঠোর আইন ব্যাখ্যার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করা।
যখন কংগ্রেস ও ফেডারেল ট্রেড কমিশনের (FTC) মধ্যে অর্থায়ন সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, তখন তিনি মত দেন যে, অর্থ বরাদ্দ বিল পাস না হওয়া পর্যন্ত সংস্থার কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। পরে তিনি আরেকটি মত দেন, যেখানে জরুরি বা অপরিহার্য সেবা চালু রাখার অনুমতি দেওয়া হয়।
তখন তিনি বুঝতে পারেননি যে, এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে মার্কিন রাজনীতির অন্যতম বড় সংঘাতের মঞ্চ তৈরি করবে।
“আমি কখনো কল্পনাও করিনি এই ধরনের শাটডাউন এত দীর্ঘ সময় স্থায়ী হবে এবং রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে,”—২০২২ সালে মারা যাওয়ার আগে সিভিলেটি The Washington Post-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন।
কীভাবে বিকশিত হলো এই ‘শাটডাউন’ রাজনীতি
পরবর্তী ১৫ বছরে কোনো বড় ধরনের সরকারি অচলাবস্থা দেখা যায়নি। কিন্তু ১৯৯৪ সালে রিপাবলিকানরা নিউট গিংরিচের নেতৃত্বে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলে তারা ওয়াশিংটনকে সংস্কারের অঙ্গীকার করে। ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সঙ্গে তাদের সবচেয়ে বড় সংঘাত ছিল সরকার বন্ধ নিয়ে।
ইতিহাসবিদরা একমত যে, এই সংঘাতগুলো রিপাবলিকানদের জন্য লাভজনক ছিল না। বরং ক্লিনটন জনগণের কাছে নিজের অবস্থান মজবুত করতে সক্ষম হন এবং পুনরায় নির্বাচিত হন।
লিস-ম্যাকরে কলেজের ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক মাইক ডেভিস বলেন, “গিংরিচ যুগের রিপাবলিকানরা কিছু সীমিত নীতি-সংক্রান্ত বিজয় পেলেও সামগ্রিকভাবে এটি তাদের জন্য একটি ব্যর্থতা ছিল।”
এরপর ২০১৩ সালে আবারও উল্লেখযোগ্য শাটডাউন ঘটে, যখন ‘টি পার্টি’ রিপাবলিকানরা প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে এসে এই ধারা আরও দীর্ঘ ও রাজনৈতিক রূপ পায়, যেখানে ডেমোক্র্যাটরাও এই কৌশল ব্যবহার শুরু করে।
কীভাবে এই শাটডাউনটি আলাদা
আগের শাটডাউনগুলোতে প্রেসিডেন্ট প্রশাসন সমানভাবে সকল সংস্থায় একই নিয়ম প্রয়োগ করত।
“রিগ্যানের আমলে যে নিয়মে বন্ধ হতো, ক্লিনটনের আমলেও তা একইভাবে প্রযোজ্য ছিল,” বলেন চার্লস টাইফার, যিনি সাবেক হাউসের অ্যাক্টিং জেনারেল কাউন্সেল ও বাল্টিমোর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক।
তিনি বলেন, “এইবারের শাটডাউনে ট্রাম্প প্রশাসন একধরনের ‘স্বেচ্ছাচারী প্রেসিডেন্টিয়াল তহবিল ব্যয়ক্ষমতা’ প্রয়োগ করছে—যা মূল সংবিধান ও Antideficiency Act-এর পরিপন্থী।”
প্রশাসন এবার তহবিল সংকটকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক রূপ দিয়েছে। বিভিন্ন সংস্থা তাদের সরকারি ওয়েবসাইটে ডেমোক্র্যাটদের দোষারোপ করে বিবৃতি যুক্ত করছে। প্রতিরক্ষা বিভাগ (Department of Defense) গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিল ব্যবহার করে সক্রিয় সামরিক সদস্যদের বেতন দিচ্ছে।
এমনকি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ৪,০০০-এরও বেশি ফেডারেল কর্মী ছাঁটাইয়ের চেষ্টা করেছেন—যাদের অধিকাংশই ডেমোক্র্যাটদের অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পে যুক্ত।
হোয়াইট হাউসে এক মধ্যাহ্নভোজে GOP (রিপাবলিকান) সেনেটরদের সামনে ট্রাম্প বাজেট পরিচালক রাস ভটকে (Russ Vought) পরিচয় করিয়ে দেন “Darth Vader” হিসেবে, এবং গর্বের সঙ্গে বলেন—
“আমি ডেমোক্র্যাটদের অগ্রাধিকারগুলো কেটে ফেলছি, ওরা আর কোনোদিন সেগুলো ফিরে পাবে না।”