নিউইয়র্কে সম্পত্তি করের চাপ বাড়ছে, স্থানীয় সরকারগুলো দুই শতাংশ সীমা ছাড়ানোর প্রস্তুতিতে
নিউইয়র্কের বহু স্থানীয় সরকার বাড়তি ব্যয় সামলাতে সম্পত্তি করের দুই শতাংশ সীমা ছাড়ানোর পরিকল্পনা করছে বলে সরকারি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
নিউইয়র্কে সম্পত্তি করের চাপ বাড়ছে, স্থানীয় সরকারগুলো দুই শতাংশ সীমা ছাড়ানোর প্রস্তুতিতে
নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে স্থানীয় সরকারগুলোর ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে। এর প্রভাব পড়তে পারে বাড়ির মালিক ও সম্পত্তি করদাতাদের ওপরও। অঙ্গরাজ্যের নিয়ন্ত্রক সংস্থা, নিউইয়র্ক স্টেট কম্পট্রোলারের কার্যালয়ের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিভিন্ন শহর, কাউন্টি, টাউন, ভিলেজ এবং অন্যান্য স্থানীয় প্রতিষ্ঠান সম্পত্তি করের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করার পরিকল্পনা করছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে বাড়তে থাকা ব্যয়, ধীরগতির রাজস্ব বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির চাপকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নিউইয়র্কে সম্পত্তি কর বৃদ্ধির ওপর সাধারণভাবে একটি সীমা রয়েছে। স্থানীয় সম্পত্তি করের বার্ষিক বৃদ্ধি সাধারণত ২ শতাংশ অথবা নির্দিষ্ট মূল্যস্ফীতি-ভিত্তিক সীমার মধ্যে যেটি কম, সেই সীমায় রাখা হয়। তবে আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে স্থানীয় সরকার এই সীমা অতিক্রম করতে পারে। ফলে ‘কর দুই শতাংশের বেশি বাড়ানো যাবে না’—এমন সরল অর্থ এই আইনের ক্ষেত্রে পুরোপুরি সঠিক নয়। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে করসীমা অতিক্রমের আইনি সুযোগ রয়েছে।
স্টেট কম্পট্রোলার থমাস ডিনাপোলির কার্যালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমা অতিক্রমের পরিকল্পনা করা স্থানীয় সরকারের সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে শহরগুলোর মধ্যে ২০২৫ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৪৯ দশমিক ২ শতাংশ করসীমা অতিক্রমের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল। ২০২৬ অর্থবছরের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৪৫ শতাংশ। ২০২২ সালে একই ধরনের পরিকল্পনা জানিয়েছিল মাত্র ১৩ দশমিক ১ শতাংশ শহর।
অর্থাৎ স্থানীয় সরকারের আর্থিক চাপ কয়েক বছরের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর পেছনে একটি কারণ হলো করোনাভাইরাস মহামারির সময় পাওয়া ফেডারেল সহায়তা অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় বাজেটকে সাময়িকভাবে স্বস্তি দিয়েছিল। পাশাপাশি কিছু এলাকায় বিক্রয় কর থেকে রাজস্বও বেড়েছিল। কিন্তু সেই সহায়তার বড় অংশ শেষ হয়ে যাওয়ার পর স্থানীয় সরকারগুলোকে নিজেদের নিয়মিত আয়ের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির কারণে স্থানীয় সরকারের ব্যয় বেড়েছে। কর্মীদের বেতন, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ, পুলিশ ও অগ্নিনির্বাপণ, পরিবহন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য নাগরিক সেবার খরচ আগের তুলনায় বেশি হয়েছে। ফলে একই পরিমাণ কর আদায় করে আগের মতো সেবা চালিয়ে যাওয়া অনেক স্থানীয় সরকারের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শুধু শহর নয়, নিউইয়র্কের টাউন ও ভিলেজগুলোর মধ্যেও করসীমা অতিক্রমের পরিকল্পনা বেড়েছে। ২০২৬ অর্থবছরের জন্য ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ ভিলেজ এবং ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ টাউন করসীমা অতিক্রমের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। ২০২২ সালে এই হার ছিল যথাক্রমে ২২ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ।
কাউন্টিগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ অর্থবছরের জন্য নিউইয়র্কের প্রায় এক-চতুর্থাংশ কাউন্টি করসীমা অতিক্রমের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। ২০২২ সালে এই হার ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। এর অর্থ হলো স্থানীয় পর্যায়ে বাজেটের ঘাটতি সামলানোর জন্য কর আদায় বাড়ানোর প্রবণতা ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে।
তবে এর মানে এই নয় যে প্রতিটি স্থানীয় সরকার শেষ পর্যন্ত কর বাড়াবেই। কম্পট্রোলারের কার্যালয় স্পষ্ট করেছে, কোনো স্থানীয় সরকার করসীমা অতিক্রম করার পরিকল্পনা জানিয়েছে মানেই চূড়ান্তভাবে তা কার্যকর হবে—এমন নয়। বাজেট অনুমোদনের সময় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে এবং সীমার ভেতরেও থাকতে পারে।
স্কুল জেলাগুলোর ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি আরও আলাদা। স্কুল জেলা করসীমা অতিক্রম করতে চাইলে ভোটারদের অনুমোদন প্রয়োজন হয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবকে কমপক্ষে ৬০ শতাংশ ভোটে অনুমোদিত হতে হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্কুল জেলাগুলোর মধ্যেও এই ধরনের পরিকল্পনা বেড়েছে। ২০২৪ অর্থবছর থেকে ২০২৬ অর্থবছরের মধ্যে করসীমা অতিক্রমের পরিকল্পনা করা স্কুল জেলার অংশ ২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে।
এর সরাসরি প্রভাব বাড়ির মালিকদের ওপর পড়তে পারে। স্থানীয় সম্পত্তি করের পরিমাণ বাড়লে মাসিক বা বার্ষিক আবাসন ব্যয়ও বাড়তে পারে। যারা বাড়ির মালিক, তাঁদের সম্পত্তি করের পাশাপাশি মর্টগেজ, বীমা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য ব্যয়ও বহন করতে হয়। ফলে কর বৃদ্ধি অনেক পরিবারের সামগ্রিক আবাসন ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।
তবে ভাড়াটিয়াদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ির মালিকের সম্পত্তি কর ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বেড়ে গেলে কিছু ক্ষেত্রে বাড়িভাড়া বাড়ানোর চাপ তৈরি হতে পারে। যদিও সম্পত্তি কর বাড়লেই কোনো নির্দিষ্ট বাড়ির ভাড়া অবশ্যই বাড়বে—এমন সরাসরি নিয়ম নেই। ভাড়ার ওপর বাজার পরিস্থিতি, আবাসনের চাহিদা, স্থানীয় আইন ও বাড়ির মালিকের সিদ্ধান্তসহ অনেক বিষয় প্রভাব ফেলে।
নিউইয়র্কে বসবাসকারী বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্যও বিষয়টি নজরে রাখার মতো। বিশেষ করে যারা নিজেদের বাড়ির মালিক, তাঁদের স্থানীয় কর কর্তৃপক্ষের নোটিশ, বাজেট প্রস্তাব ও সম্পত্তি করের মূল্যায়ন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা উচিত। কর বাড়ানোর প্রস্তাব এলে স্থানীয় শুনানি বা আপত্তি জানানোর সুযোগ আছে কি না, সেটিও সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকারের নিয়ম অনুযায়ী যাচাই করা প্রয়োজন।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—সম্পত্তি করের সীমা অতিক্রমের পরিকল্পনা একটি রাজ্যব্যাপী প্রবণতা হলেও প্রতিটি শহর বা এলাকার পরিস্থিতি এক নয়। নিউইয়র্ক সিটি, লং আইল্যান্ড, ওয়েস্টচেস্টার, আপস্টেট নিউইয়র্ক বা অন্য কোনো এলাকার কর কাঠামো, সম্পত্তির মূল্য এবং স্থানীয় বাজেট আলাদা। তাই পুরো নিউইয়র্কে একই হারে কর বাড়বে—এমন ধারণা সঠিক নয়।
স্টেট কম্পট্রোলারের কার্যালয় স্থানীয় সরকারগুলোকে জনগণের সঙ্গে বাজেট পরিস্থিতি নিয়ে স্বচ্ছ যোগাযোগ রাখার আহ্বান জানিয়েছে। কারণ কর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সরাসরি স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর আর্থিক প্রভাব ফেলতে পারে। জনগণকে জানানো, কেন অতিরিক্ত রাজস্ব প্রয়োজন এবং অর্থ কোথায় ব্যয় হবে—এসব তথ্য প্রকাশ করা স্থানীয় সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বোঝা যায়, নিউইয়র্কের স্থানীয় সরকারগুলো মহামারি-পরবর্তী সময়ে নতুন আর্থিক বাস্তবতার মুখোমুখি। ফেডারেল সহায়তা কমে যাওয়া, রাজস্ব বৃদ্ধির গতি ধীর হওয়া এবং মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ফলে স্থানীয় বাজেটে চাপ তৈরি হয়েছে। এর একটি সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে সম্পত্তি করের সীমা অতিক্রমের পথ বেছে নিচ্ছে কিছু স্থানীয় সরকার।
তবে করসীমা অতিক্রমের পরিকল্পনা নিয়ে শেষ সিদ্ধান্ত স্থানীয় বাজেট প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে। তাই বাড়ির মালিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের এলাকার বাজেট প্রস্তাব ও কর-সংক্রান্ত সরকারি নোটিশ নিয়মিত দেখা। কোনো সংবাদে পুরো নিউইয়র্কের কর একসঙ্গে বাড়ছে বলা হলে সেটিও যাচাই করা জরুরি।