এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে ঘিরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিডিয়া ক্যাম্পেইন বনাম প্রকৃত সত্য!
হাজার কোটি টাকার কর মওকুফের নজির থাকা দেশে খামারিদের পুষ্টি পণ্যে ২–৪ কোটির সাধারণ আবেদন নিয়েই কেন তুলকালাম?
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে ঘিরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিডিয়া ক্যাম্পেইন বনাম প্রকৃত সত্য!
গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যমের মূল দায়িত্ব সত্য তুলে ধরা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই গণমাধ্যম যখন সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট আড়াল করে বেছে বেছে খণ্ডিত তথ্য প্রকাশ করে জনমনে ভুল বার্তা দেয়, তখন তা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা না হয়ে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর রাজনৈতিক চরিত্র হনন বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ক্যাম্পেইনে রূপ নেয়।
সম্প্রতি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং তাঁর পারিবারিক বাণিজ্যিক উদ্যোগ নিয়ে দেশের কিছু শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ধারাবাহিক প্রতিবেদন সেই পুরোনো বিতর্ককেই নতুন করে সামনে এনেছে। সংশ্লিষ্ট খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, অর্থনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে—যেখানে হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ ও কর ছাড়ের নজির সমাজে স্বাভাবিকভাবে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে মীর শাহে আলমের পরিবারের অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট আইনি ব্যবসাকে বিরাট কেলেঙ্কারি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
কর মওকুফের আবেদন কি কোনো অপরাধ?
আলোচিত সংবাদমাধ্যমগুলোর অন্যতম প্রধান অভিযোগ—প্রতিমন্ত্রীর পারিবারিক প্রতিষ্ঠান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে কর মওকুফের আবেদন করেছে। কিন্তু দেশের প্রচলিত কর আইন এবং বাণিজ্যিক বিধিবিধান অনুযায়ী, যেকোনো শিল্প বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নীতিগত সুবিধা, শুল্ক রেয়াত বা কর প্রত্যাহারের জন্য সরকারের নিকট আবেদন করার পূর্ণ আইনি অধিকার রাখে।
বাণিজ্যিক বিশ্লেষকরা বলছেন, "আবেদন করা" আর "অবৈধ সুবিধা আদায় করা" এক বিষয় নয়। রাজস্ব বোর্ড আবেদনটি যৌক্তিক মনে করলে বিবেচনা করবে, অযৌক্তিক মনে করলে নাকচ করবে। আবেদন মঞ্জুর হওয়ার আগেই কেবল একটি নিয়মিত দাপ্তরিক চিঠিপত্রকে কেন্দ্র করে এমনভাবে প্রচার চালানো হচ্ছে যেন কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়ে গেছে।
তুলনামূলক চিত্র: ৩ হাজার কোটি বনাম ৩ কোটি টাকা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের তোলা নথিপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কর ছাড়ের ক্ষেত্রে দেশে রয়েছে বিশাল সব নজির।
│ প্রতিষ্ঠান / ব্যক্তি │ প্রাপ্ত সুবিধা / আবেদনের বিবরণ │
│ এস আলম গ্রুপ (২০১৯) │ ৩,১৭০ কোটি টাকার বিশাল কর মওকুফ │
│ ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক (২০২৪ এনবিআর)│ ২০২৯ সাল পর্যন্ত সামগ্রিক করমুক্ত │
│ মীর শাহে আলমের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান │ ২ থেকে ৪ কোটি টাকার সাধারণ শুল্ক │
│ (পোল্ট্রি ও ডেইরি খাতের পুষ্টিকর খাদ্য আমদানি) │ মওকুফের নিয়মিত আইনি আবেদন মাত্র │
যে দেশে বিগত শাসনামলে এস আলম গ্রুপের মতো করপোরেট জায়ান্টকে এক টেবিলেই ৩ হাজার ১৭০ কোটি টাকার কর মওকুফ করে দেওয়া হয়েছে, কিংবা নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংককে ২০২৯ সাল পর্যন্ত সামগ্রিক করমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়েছে—সেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি আমদানি পণ্যে মাত্র ২ থেকে ৪ কোটি টাকার সাধারণ শুল্ক ছাড়ের আবেদন নিয়ে ঝড় তোলা স্রেফ দ্বিমুখী নীতি ছাড়া আর কিছু নয়।
পণ্যটির উপকারিতা: সুবিধাভোগী কে, প্রতিমন্ত্রী নাকি দেশের খামারিরা?
প্রতিমন্ত্রীর পরিবারের প্রতিষ্ঠানটি কোন পণ্যের ওপর কর সুবিধা চেয়েছে, তা-ও প্রতিবেদনে পরিকল্পিতভাবে স্পষ্ট করা হয়নি। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এটি কোনো বিলাসদ্রব্য বা আমোদ-প্রমোদের পণ্য নয়; এটি পোল্ট্রি, ডেইরি ও প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য অপরিহার্য হাই-নিউট্রিশন সাপ্লিমেন্ট ও কাঁচামাল।
দেশের পোল্ট্রি ও ডেইরি শিল্পের বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ পশুখাদ্য ও প্রোটিন সাপ্লিমেন্টের আকাশচুম্বী দাম। এই জাতীয় পুষ্টি উপাদানে সরকার যদি সামান্য শুল্ক ছাড় দেয়, তবে তার সরাসরি সুবিধা পান দেশের লাখ লাখ প্রান্তিক খামারি। এর ফলে ডিম, দুধ ও মাংসের উৎপাদন খরচ কমে এবং সাধারণ মানুষের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে প্রোটিন পৌঁছানো সম্ভব হয়। অর্থাৎ, এই শুল্ক ছাড়ের সুবিধা প্রতিমন্ত্রীর পকেটে নয়, বরং সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতিতে বহুগুণ হয়ে ফেরত আসত। অথচ জনকল্যাণমূলক এই উদ্যোগকেই উপস্থাপন করা হয়েছে ব্যক্তিগত সুবিধা লাভের চেষ্টা হিসেবে।
৭১ কোটি টাকার টেন্ডার: বাস্তবতার অপব্যাখ্যা:
প্রতিমন্ত্রীর ছেলের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ তোলা হয়েছে—গত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ১৩টি টেন্ডারের মাধ্যমে ৭১ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে।
যারা বাংলাদেশের নির্মাণ ও ঠিকাদারি খাতের সাধারণ হিসাব বোঝেন, তারা জানেন যে বর্তমান বাজারে জেলা পর্যায়ের একজন মাঝারি সারির প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদারেরও বার্ষিক টার্নওভার ১০০ কোটি টাকার ওপরে হয়ে থাকে। তদুপরি, তথ্যানুসন্ধানে পাওয়া যায়:
১. মোট ৭১ কোটি টাকার মধ্যে ২১ কোটি এবং ২৫ কোটি টাকার দুটি বড় কাজ প্রতিষ্ঠানটি পেয়েছিল উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় বসার আগেই।
২. কাজগুলো কোনো বিশেষ কোটায় বা একক আদেশে দেওয়া হয়নি; সরকারি ই-জিপি (e-GP) পোর্টালের মাধ্যমে শতভাগ প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতিতে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পাওয়া।
বিগত সরকারের আমলে বৈধ প্রক্রিয়ায় শুরু হওয়া কাজগুলোকে বর্তমান দায়িত্বের সঙ্গে জড়িয়ে "মন্ত্রীপুত্রের ক্ষমতার দাপট" হিসেবে রং চড়ানো স্রেফ হলুদ সাংবাদিকতারই নামান্তর।
২০০১-০৬ সালের সেই চেনা ছক ও আধুনিক অ্যালগরিদম:
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বর্তমান এই পরিস্থিতিকে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের গণমাধ্যম পরিস্থিতির সাথে তুলনা করছেন। সেই সময়ও সুনির্দিষ্ট কিছু গণমাধ্যমকর্মী তথ্যের বিকৃত উপস্থাপন ও খণ্ডিত রিপোর্ট প্রকাশের মাধ্যমে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার ধারাবাহিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছিল। পরবর্তীতে যাদের অনেকেই নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন চেয়েছেন এবং তাদের তৈরি প্রতিবেদনের অসত্যতা বিভিন্ন গবেষক ও স্বাধীন বিশ্লেষকদের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক অ্যালগরিদমকে ব্যবহার করে একই চক্র আবার সক্রিয় হয়েছে। শিশুদের নিখোঁজ সংক্রান্ত নিয়মিত পুলিশি পরিসংখ্যানের ভুল ব্যাখ্যা, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সংবেদনশীল সম্পর্কের খবরকে রাজনৈতিক মোড়ক দেওয়া এবং স্বাভাবিক বাণিজ্যকে অতিরঞ্জিত করে ফটোকার্ড ছড়ানো—সবই একই সূত্রে গাঁথা
গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই সময়ে সরকারের ভুলত্রুটির সমালোচনা অবশ্যই কাম্য। তবে সেই সমালোচনা হতে হবে তথ্যভিত্তিক, সুষম এবং সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। পাহাড়সম আর্থিক অপরাধীদের নাম উচ্চারণে যাদের দ্বিধা থাকে, তারা যখন প্রান্তিক খামারিদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সামান্য একটি আবেদন কিংবা প্রকাশ্য টেন্ডারের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে তিল থেকে তাল বানিয়ে উপস্থাপন করে, তখন সচেতন নাগরিক সমাজের দায়িত্ব সত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারের মধ্যকার পার্থক্যটুকু চিনে নেওয়া।