মহেশখালীতে এলএনজির নতুন চালান, গ্যাস সংকটে মিলতে পারে স্বস্তি

কক্সবাজার মহেশখালীতে এলএনজির নতুন কার্গো পৌঁছানোয় গ্যাস সংকট কিছুটা কমার আশা জেগেছে। জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পখাতে ফিরতে পারে স্বস্তি।

PostImage

মহেশখালীতে এলএনজির নতুন চালান, গ্যাস সংকটে মিলতে পারে স্বস্তি


দেশের চলমান গ্যাস সংকটের মধ্যে স্বস্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে নতুন একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) কার্গো পৌঁছেছে। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা ও খালাসের প্রক্রিয়া শেষে এই এলএনজি জাতীয় গ্যাস গ্রিডে যুক্ত হলে দেশে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সৌদি আরামকোর ‘মারিয়া এনার্জি’ নামের একটি এলএনজিবাহী জাহাজ মহেশখালীর টার্মিনালে নোঙর করেছে। কার্গোটি থেকে এলএনজি খালাস করে পুনঃগ্যাসীকরণের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। নতুন এই চালান যুক্ত হওয়ায় গ্যাসের ঘাটতিতে থাকা বিভিন্ন খাতে সাময়িক স্বস্তি আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

মহেশখালীতে বর্তমানে দুটি ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) রয়েছে। এর একটি পরিচালনা করছে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি এবং অন্যটি সামিট। দুটি টার্মিনালের সম্মিলিত দৈনিক গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে পর্যাপ্ত এলএনজি সরবরাহ না থাকায় সবসময় টার্মিনাল দুটির পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না।

সাম্প্রতিক সময়ে এলএনজি সরবরাহে ঘাটতির কারণে দেশের গ্যাস ব্যবস্থায় চাপ বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে। গ্যাসের চাপ কমে গেলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এই পরিস্থিতিতে নতুন এলএনজি কার্গোর আগমনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন চালানটি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি সামনে আরও কয়েকটি এলএনজি কার্গো দেশে আসার কথা রয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীর কাছ থেকে একাধিক চালান আসার পরিকল্পনা রয়েছে।

নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, ৪ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের একটি কার্গো, ১০ সেপ্টেম্বর সৌদি আরামকোর আরেকটি কার্গো এবং ১৩ সেপ্টেম্বর পসকোর একটি কার্গো দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এরপর ১৬ সেপ্টেম্বর গানভোর, ১৮ সেপ্টেম্বর সৌদি আরামকো, ২৩ সেপ্টেম্বর টোটাল এবং ২৮ সেপ্টেম্বর গানভোরের আরও একটি কার্গো আসার কথা রয়েছে।

শুধু নির্ধারিত চালান নয়, গ্যাসের চাহিদা সামাল দিতে আরও এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন অনুযায়ী নতুন কয়েকটি কার্গো কেনার প্রক্রিয়াও এগিয়ে চলছে। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহে ধারাবাহিকভাবে এলএনজি দেশে পৌঁছালে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে নতুন কার্গো এলেই দেশের গ্যাস সংকট পুরোপুরি কেটে যাবে—এমনটা মনে করছেন না সংশ্লিষ্টরা। কারণ দেশে গ্যাসের চাহিদা প্রতিদিনই বেশি। বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি শিল্পকারখানা, সার কারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য খাতে বিপুল পরিমাণ গ্যাস প্রয়োজন হয়। ফলে আমদানি করা এলএনজি দ্রুত জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পাশাপাশি টার্মিনালগুলোর সর্বোচ্চ সক্ষমতা কাজে লাগানোও গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের দামও বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম বাড়লে একই পরিমাণ গ্যাস আমদানিতে সরকারের ব্যয় বেড়ে যায়। তাই স্বল্পমেয়াদে এলএনজি আমদানি করে সংকট সামাল দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি কমাতে আমদানিকৃত এলএনজির পাশাপাশি দেশের নিজস্ব গ্যাসের উৎসগুলোকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, বিদ্যমান ক্ষেত্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো এবং গ্যাস সঞ্চালন অবকাঠামোর উন্নয়ন করা গেলে আমদানিনির্ভরতার চাপও ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে মহেশখালীতে নতুন এলএনজি কার্গোর আগমন তাই দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় একটি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। সামনে নির্ধারিত কার্গোগুলো সময়মতো দেশে পৌঁছে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা গেলে গ্যাস সরবরাহের চাপ কিছুটা কমতে পারে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পখাতে স্বাভাবিকতা ফেরার পাশাপাশি সামগ্রিক জ্বালানি পরিস্থিতিতেও সাময়িক স্বস্তি আসতে পারে।

তবে এই স্বস্তি কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে এলএনজি সরবরাহের ধারাবাহিকতা, টার্মিনালগুলোর কার্যকর ব্যবহার এবং দেশের মোট গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধানের ওপর। তাই মহেশখালীতে নতুন কার্গো পৌঁছানোকে আপাতত গ্যাস সংকট মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তির পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ও জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নের ওপরও জোর দিতে হবে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর