খেলাপি ঋণের পাহাড়ে বাংলাদেশ: ব্যাংকের প্রতি ৩ টাকার প্রায় ১ টাকাই অনাদায়ী

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ মূল্যায়ন বলছে, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত বা NPL ratio দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এখন অনাদায়ী বা সমস্যাগ্রস্ত। একই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকগুলোর গড় NPL ছিল মাত্র ৭ দশমিক ৯ শতাংশ—বাংলাদেশের তুলনায় চারগুণেরও কম

খেলাপি ঋণের পাহাড়ে বাংলাদেশ: ব্যাংকের প্রতি ৩ টাকার প্রায় ১ টাকাই অনাদায়ী

খেলাপি ঋণের পাহাড়ে বাংলাদেশ: ব্যাংকের প্রতি ৩ টাকার প্রায় ১ টাকাই অনাদায়ী


বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ এখন আর কেবল ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এটি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ মূল্যায়ন বলছে, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত বা NPL ratio দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এখন অনাদায়ী বা সমস্যাগ্রস্ত। একই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকগুলোর গড় NPL ছিল মাত্র ৭ দশমিক ৯ শতাংশ—বাংলাদেশের তুলনায় চারগুণেরও কম। 

বাংলাদেশের ব্যাংকিং সংকটের ভয়াবহতা বোঝাতে আরও একটি তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশের পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার capital-to-risk-weighted assets ratio ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে যায়। অর্থাৎ বিপুল খেলাপি ঋণের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর ক্ষতি শোষণ করার মূলধনী সক্ষমতাও মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়েছে। 

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে উদ্বেগজনক

আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশের খেলাপি ঋণের হিসাব পদ্ধতি এক নয়। তাই “বিশ্বে খেলাপি ঋণে বাংলাদেশ এক নম্বরে”—এমন দাবি সরাসরি করা তথ্যগতভাবে যথেষ্ট সতর্কতার দাবি রাখে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান যে অত্যন্ত খারাপ, তা বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। বাংলাদেশের NPL ratio যেখানে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ, সেখানে আঞ্চলিক গড় মাত্র ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। 

কেন তৈরি হলো এমন সংকট?

বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থার পেছনে দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স, regulatory capture এবং related-party lending-কে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দীর্ঘদিনের দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের সুবিধা এবং যথাযথ তদারকির ঘাটতি ব্যাংকের সম্পদের মানকে দুর্বল করেছে। 

পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়েছে যখন ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা যাচাই এবং ঋণ শ্রেণীকরণে কঠোরতা বাড়ানো হয়েছে। ফলে আগে বিভিন্নভাবে আড়ালে থাকা সমস্যাগ্রস্ত ঋণের একটি বড় অংশ এখন হিসাবের খাতায় উঠে আসছে।

ব্যাংকিং খাতের সংকট অর্থনীতিতেও আঘাত হানছে

বাংলাদেশের মোট আর্থিক খাতের সম্পদের প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যাংকিং খাতের হাতে। ফলে ব্যাংকের দুর্বলতা সরাসরি অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহ, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও ব্যবসা সম্প্রসারণে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্বব্যাংকও বলছে, স্থিতিশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধারের জন্য অপরিহার্য। 

এই পরিস্থিতিতে ব্যাংক সংস্কারে আন্তর্জাতিক সহায়তাও জোরদার হচ্ছে। ২০২৬ সালের জুনে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত শক্তিশালী করতে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করেছে। এর লক্ষ্য আমানত সুরক্ষা, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা, ব্যাংক পুনর্গঠন এবং আর্থিক খাতের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা। 

সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

খেলাপি ঋণ কমাতে শুধু নতুন নীতিমালা নয়, ঋণ অনুমোদনে জবাবদিহি, বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন এবং প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি। অন্যথায় খেলাপি ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের মূলধন, আমানতকারীর আস্থা এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—বাংলাদেশের NPL ratio দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের চারগুণের বেশি।


সূত্র: বিশ্বব্যাংক, Financial Sector Support Project II, ২৪ জুন ২০২৬; বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং খাতের পরিসংখ্যান। 

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর