বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে ভয়াবহ জলবায়ু বিপর্যয়ের দিকে: ‘আরও বড় ধাক্কা আসছে
আমেরিকান লেখক কিম স্ট্যানলি রবিনসনের “দ্য মিনিস্ট্রি ফর দ্য ফিউচার” উপন্যাসের শুরুতেই ভারতের একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির বর্ণনা রয়েছে। তীব্র তাপপ্রবাহের সঙ্গে বিদ্যুৎ গ্রিড ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ২ কোটি মানুষ মারা যায়। এই বিপর্যয়ের পর বিশ্বের দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ হয়
বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে ভয়াবহ জলবায়ু বিপর্যয়ের দিকে: ‘আরও বড় ধাক্কা আসছে
আমেরিকান লেখক কিম স্ট্যানলি রবিনসনের “দ্য মিনিস্ট্রি ফর দ্য ফিউচার” উপন্যাসের শুরুতেই ভারতের একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির বর্ণনা রয়েছে। তীব্র তাপপ্রবাহের সঙ্গে বিদ্যুৎ গ্রিড ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ২ কোটি মানুষ মারা যায়। এই বিপর্যয়ের পর বিশ্বের দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ হয়।
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে বিশ্বে তাপপ্রবাহ, ঝড়, বন্যা ও খরার মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন এবং আরও তীব্র হবে। কিন্তু একসময় যা কেবল কল্পকাহিনির বিষয় বলে মনে হতো, এখন সেটিকেই সম্ভাব্য—এমনকি অনিবার্য—পরিস্থিতি হিসেবে আলোচনা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা এমন পরিস্থিতিকে “চরমেরও চরম” বা “দ্য আদার বিগ ওয়ান” হিসেবে উল্লেখ করছেন। নামটি ক্যালিফোর্নিয়ায় ভবিষ্যতে ঘটতে পারে এমন বড় ভূমিকম্পের প্রচলিত ‘বিগ ওয়ান’ ধারণা থেকে নেওয়া।
তবে এ ধরনের সতর্কতা দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ আবহাওয়াজনিত ভয়াবহ বিপর্যয় ঠিক কখন ঘটবে, তা কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন না। কিন্তু গত কয়েক বছরে পৃথিবীতে বড় ধরনের জলবায়ু বিপর্যয়ের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশগত উপাদানগুলো ক্রমেই তৈরি হচ্ছে। ফলে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগও বাড়ছে।
ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট ফর ওয়াটার রিসোর্সেসের জলবায়ুবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল সোয়াইন বলেন, মানুষ যেন মনে না করে বিজ্ঞানীরা অতিরঞ্জিত করে কথা বলছেন—এটাই বড় ঝুঁকি। তাঁর মতে, এটি অনেকটা ‘বয় হু ক্রাইড উলফ’ বা বারবার বিপদের সতর্কতা দেওয়ার গল্পের মতো। কিন্তু যদি সত্যিই বিপদ দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়, তাহলে মানুষ কি আগে থেকেই সেটি সম্পর্কে জানতে চাইবে না?
১৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করা হচ্ছে
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, মানুষ যদি বর্তমান হারে গ্যাস, তেল ও কয়লা ব্যবহার অব্যাহত রাখে, তাহলে পৃথিবীতে তাপপ্রবাহ, ঝড়, বন্যা ও খরার মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও তীব্র হবে।
১৮৫০-এর দশকে নিউইয়র্কের সেনেকা ফলসে বসবাসের সময় অপেশাদার বিজ্ঞানী ইউনিস নিউটন ফুট একাধিক পরীক্ষা চালান। তিনি কার্বন ডাই-অক্সাইড ও আর্দ্র বাতাসসহ বিভিন্ন পদার্থ কাচের সিলিন্ডারে রেখে সেগুলো সূর্যের আলোতে রাখেন।
তিনি দেখতে পান, কার্বন ডাই-অক্সাইড থাকা সিলিন্ডারগুলো দ্রুত উত্তপ্ত হয় এবং সূর্য ডোবার পরও তুলনামূলক বেশি সময় ধরে তাপ ধরে রাখে।
কার্বন ডাই-অক্সাইড হলো একটি গ্রিনহাউস গ্যাস, যা কয়লা, গ্যাস ও তেল পোড়ানোর ফলে বায়ুমণ্ডলে নির্গত হয়।
এরপর দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। বর্তমানে বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে জমা হওয়ার কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে।
২০২৫ সালে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ১৮০০ সালের শুরুর দিকের তুলনায় ১.৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস (২.৫৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট) বেশি ছিল।
এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলো শুধু বেশি ঘন ঘন ঘটছে না, বরং সেগুলোর তীব্রতাও বাড়ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি অবদান কোন দেশের?
এপি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত করা দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনে দেশটির অবদানও সবচেয়ে বেশি।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের সময়ে দেশটির কাছ থেকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বড় ধরনের সরকারি উদ্যোগের প্রত্যাশা করা হচ্ছে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জলবায়ু পরিবর্তনকে “ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতারণা” হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জলবায়ু নীতিকে “গ্রিন নিউ স্ক্যাম” বলেছেন এবং জাতিসংঘের জলবায়ু পূর্বাভাসকে “বোকা মানুষদের তৈরি” বলে মন্তব্য করেছেন।
প্রতিবেদনটির মূল সতর্কবার্তা হলো—জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, বরং একই সময়ে একাধিক ভয়াবহ দুর্যোগ আঘাত হানার ঝুঁকি বাড়ছে। তীব্র তাপপ্রবাহ, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিপর্যয়, বন্যা, খরা ও ভয়াবহ ঝড় একসঙ্গে বা পরপর আঘাত করলে তার প্রভাব বর্তমান দুর্যোগগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ভয়াবহ হতে পারে।
এ কারণে বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভবিষ্যতের বড় জলবায়ু বিপর্যয়কে কেবল কল্পকাহিনি হিসেবে দেখা উচিত নয়—পৃথিবীর বর্তমান উষ্ণায়নের প্রবণতাই আরও বড় ধাক্কার ঝুঁকি তৈরি করছে।
লেখক: পিটার প্রেঙ্গাম্যান
সূত্র : এপি।