ইরানের নতুন সামরিক নেতৃত্ব, যুদ্ধের পর মোজতবা খামেনির ক্ষমতা সংহত করার বার্তা
ইরানের নতুন সামরিক নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন—কিন্তু এটি কি শুধু যুদ্ধের পর কমান্ড পুনর্গঠন, নাকি ক্ষমতা আরও শক্তভাবে সংহত করার কৌশল?
ইরানের নতুন সামরিক নেতৃত্ব, যুদ্ধের পর মোজতবা খামেনির ক্ষমতা সংহত করার বার্তা
ইরানে যুদ্ধ-পরবর্তী সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় ধরনের রদবদল ঘটিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। শীর্ষ সামরিক ও নিরাপত্তা পদগুলোতে অভিজ্ঞ এবং দীর্ঘদিনের বিপ্লবী-নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বসানোর এই সিদ্ধান্তকে শুধু যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি পূরণ বা প্রশাসনিক পুনর্গঠন হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। বরং নতুন নিয়োগগুলো ইরানের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নীতি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতি অবস্থান এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার কৌশল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে।
১০ আগস্ট মোজতবা খামেনি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির প্রধান, আইআরজিসির নৌবাহিনী, বাসিজ বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন কমান্ডার নিয়োগ দেন। আলী আবদোল্লাহিকে সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ, কিয়োমার্স হেইদারিকে তার ডেপুটি, আহমাদ ওয়াহিদিকে আইআরজিসির কমান্ডার-ইন-চিফ এবং মোস্তফা ইজাদিকে আইআরজিসির ডেপুটি কমান্ডার করা হয়েছে। আলী আজমাই আইআরজিসির নৌবাহিনীর প্রধান এবং সাবেক আইআরজিসি গোয়েন্দা প্রধান হোসেইন তাইয়েবকে বাসিজ বাহিনীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এর একদিন আগেই সাবেক আইআরজিসি কমান্ডার মোহসেন রেজাইকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব করা হয়। রেজাই ১৯৮১ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত আইআরজিসির নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধের একটি বড় সময় তিনি বাহিনীটির কমান্ডার ছিলেন। ফলে তার নতুন দায়িত্বও ইরানের নিরাপত্তা ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে অভিজ্ঞ, যুদ্ধ-পরীক্ষিত নেতৃত্বকে সামনে আনার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
স্বৈরশাসন বা কঠোর কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থায় যুদ্ধের সময় সামরিক নিয়োগ অনেক সময় শুধু সামরিক দক্ষতার বিষয় থাকে না। এসব নিয়োগের মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠীর অগ্রাধিকার, সম্ভাব্য হুমকি সম্পর্কে ধারণা, প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য এবং নেতৃত্বের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগও প্রকাশ পায়।
ইরানের ক্ষেত্রেও নতুন কমান্ড কাঠামোর দুটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য রয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সংঘাত মোকাবিলায় সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করা। দ্বিতীয়ত, দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে ইসলামিক রিপাবলিকের ক্ষমতার কাঠামোকে সুরক্ষিত রাখা।
মোজতবা খামেনির নির্দেশনায় আইআরজিসির প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো এবং শত্রুর বিরুদ্ধে শক্তিশালী আক্রমণাত্মক অভিযানের প্রস্তুতির ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন কমান্ড কাঠামোর সমন্বয় ও একীভূতকরণের পরিকল্পনাও সামনে এসেছে।
নতুন নেতৃত্বের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো—এদের বড় অংশই ইরানের বিপ্লবী ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের পুরনো প্রজন্মের সঙ্গে যুক্ত।
আহমাদ ওয়াহিদি দীর্ঘদিন ধরে আইআরজিসির গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। মোস্তফা ইজাদিও ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার একজন অভিজ্ঞ কমান্ডার। আর হোসেইন তাইয়েবের বাসিজের দায়িত্বে আসা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তিনি এর আগে আইআরজিসির গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, এসব নিয়োগে নতুন বা তুলনামূলকভাবে সংস্কারমুখী নেতৃত্বের পরিবর্তে অভিজ্ঞতা, আনুগত্য ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এ কারণে নতুন সামরিক নেতৃত্বকে অনেকেই ‘যুদ্ধ-পরীক্ষিত পুরনো নিরাপত্তা কাঠামোর পুনরুত্থান’ হিসেবে দেখছেন।
ইরানের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—শীর্ষ নেতৃত্বে ব্যাপক পরিবর্তন কি দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারবে?
কমান্ডার নিহত হয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন মুখ এসেছে এবং আলী খামেনির পর তার ছেলে মোজতবা খামেনি সর্বোচ্চ নেতৃত্বে এসেছেন। কিন্তু ব্যক্তির পরিবর্তনকে সরাসরি ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়।
বাস্তব অর্থে কোনো শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন বলতে শুধু নেতৃত্বের পরিবর্তন নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক আদর্শ, নিরাপত্তা কাঠামো, সামরিক বাহিনীর ভূমিকা এবং ক্ষমতার সম্পর্কের মৌলিক রূপান্তরকে বোঝায়।
ইরানের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত পাওয়া নিয়োগগুলো বরং উল্টো একটি চিত্র তুলে ধরছে। গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ও সামরিক পদে এমন ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনা হচ্ছে, যারা ইসলামিক রিপাবলিকের নিরাপত্তা ও বিপ্লবী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। ফলে নেতৃত্বে পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের মূল নিরাপত্তা কাঠামোতে ধারাবাহিকতা বজায় থাকার প্রবণতা স্পষ্ট।নতুন সর্বোচ্চ নেতার সামনে একই সঙ্গে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে—বাহ্যিক নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা।
বাহ্যিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের অভিজ্ঞতা ইরানের সামরিক নেতৃত্বকে দ্রুত পুনর্গঠনের প্রয়োজন তৈরি করেছে। অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক বিরোধ, অর্থনৈতিক চাপ এবং সম্ভাব্য সামাজিক অস্থিরতা মোকাবিলায় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই বাস্তবতায় সামরিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের পুরনো, বিশ্বস্ত এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো মোজতবা খামেনির জন্য ক্ষমতা সংহত করার একটি উপায়ও হতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ইরানের অভ্যন্তরে সবকিছু সম্পূর্ণ স্থিতিশীল। বরং নতুন নেতৃত্বের ওপর একই সঙ্গে সামরিক পুনর্গঠন, নিরাপত্তা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক ঐক্য ধরে রাখার চাপ রয়েছে।
ইরানের নতুন সামরিক কাঠামো এখন শুধু যুদ্ধের ক্ষতি পূরণের জন্য কাজ করবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ও নিরাপত্তা নীতির ভিত্তি হয়ে উঠবে সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
নতুন নিয়োগগুলো থেকে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট: মোজতবা খামেনি আপাতত নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের পুরনো অভিজ্ঞ নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করছেন। এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি যেমন নির্দেশ করতে পারে, তেমনি দেশের অভ্যন্তরে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ শক্ত করার প্রয়োজনীয়তাও প্রকাশ করে।
সুতরাং ইরানে নেতৃত্বের পরিবর্তনকে কেবল কয়েকজন কমান্ডারের পরিবর্তন বা ‘রেজিম পরিবর্তন’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। বরং নতুন সামরিক ও নিরাপত্তা নিয়োগগুলো ইঙ্গিত করছে ইসলামিক রিপাবলিক তার মূল প্রতিষ্ঠান ও আদর্শিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখেই যুদ্ধ-পরবর্তী নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে পুনর্গঠন করছে।
এই মুহূর্তে তাই ইরানের নতুন কমান্ড কাঠামোকে শুধু একটি সামরিক অর্ডার অব বাটেল হিসেবে নয়, বরং মোজতবা খামেনির ক্ষমতা সংহতকরণ, সম্ভাব্য বহিরাগত সংঘাত মোকাবিলা এবং অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবেই দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।