ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের পথ বাংলাদেশের জন্য আত্মঘাতী: ওবায়দুল কাদের
ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের পথ বাংলাদেশের জন্য আত্মঘাতী, জাতীয় স্বার্থে সতর্ক থাকা প্রয়োজন: ওবায়দুল কাদেরের মন্তব্য।
ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের পথ বাংলাদেশের জন্য আত্মঘাতী: ওবায়দুল কাদের
ভারতের সঙ্গে বিএনপির বর্তমান সম্পর্ক ও কূটনৈতিক অবস্থান বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি অভিযোগ করেছেন, প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে মুখোমুখি অবস্থানে নিয়ে যাওয়া দেশের জাতীয় স্বার্থের জন্য ভালো হবে না।
১৭ আগস্ট ২০২৬ একটি ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে তিনি এসব কথা বলেন বলে ইন্দো বাংলা নিউজের প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী সাংবাদিক, কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের সংগঠন ‘স্মরণে ৭১, হৃদয়ে বাংলাদেশ’ ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রতিবেশী দেশকে উপেক্ষা করে তারেক রহমান যে পথে এগোচ্ছেন, তা বাংলাদেশের জন্য চরম ক্ষতিকর হতে পারে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগাযোগ ও আঞ্চলিক অবকাঠামোগত সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তবে তাঁর এই মূল্যায়নকে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে। প্রকাশ্য সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান বাংলাদেশ সরকার ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে এবং দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনাও চলছে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় পক্ষ থেকেও ইতিবাচক বক্তব্য এসেছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ৯ আগস্ট বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে বৈঠক হলে দুই দেশের বিভিন্ন অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানে অগ্রগতি হতে পারে। তিনি দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতিকে নেতিবাচকভাবে না দেখার আহ্বান জানান এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন।
এর আগে ১০ আগস্টও ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, দুই দেশের মধ্যে যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। তিনি বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে গঠনমূলক যোগাযোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়েও দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে ভারত সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। পাশাপাশি ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশ নেওয়ার জন্যও তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে ১০ আগস্ট বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ভারত সফরের আমন্ত্রণ গ্রহণের বিষয়ে তখনও সরকার কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
অর্থাৎ, ‘বিএনপি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন বা বৈরিতার পথে এগোচ্ছে’—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো সরকারি তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। বরং সাম্প্রতিক কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য সফর নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকার তথ্য পাওয়া যায়।
ওবায়দুল কাদের তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গুরুত্বও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দুই দেশের সুসম্পর্ক উভয়ের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, সম্পর্কের অবনতি হলে সীমান্ত নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশকেই ঝুঁকির মুখে পড়তে হতে পারে।
তবে নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে সাম্প্রতিক সরকারি অবস্থানের কিছু মিল রয়েছে। ভারতীয় হাইকমিশনারও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ও গঠনমূলক যোগাযোগের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
ওবায়দুল কাদের শেখ হাসিনা সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি সমুদ্রসীমা নির্ধারণ, স্থলসীমান্ত চুক্তি ও ছিটমহল বিনিময়কে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে তুলে ধরেন।
এসব ক্ষেত্রে অবশ্য ঘটনাগুলো নথিভুক্ত বাস্তবতা হলেও সেগুলোর রাজনৈতিক মূল্যায়ন নিয়ে বিভিন্ন দলের অবস্থান ভিন্ন। তাই এগুলোকে কোনো একটি দলের একক রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন না করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা অধিকতর নিরপেক্ষ।
অনুষ্ঠানে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ করেন ওবায়দুল কাদের। তিনি দাবি করেন, ওই সময়ে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন বেড়েছে, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা করা হয়েছে এবং দেশে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের জন্য সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সবগুলোর পক্ষে স্বাধীন তদন্ত বা নিরপেক্ষ প্রমাণের উল্লেখ প্রকাশিত প্রতিবেদনে নেই। ফলে সংবাদে এগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে নয়, ওবায়দুল কাদেরের রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপন করাই তথ্যনিষ্ঠ।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার ঘটনায় ড. ইউনূস ও তারেক রহমানের সম্পৃক্ততার অভিযোগও করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তবে এই অভিযোগের পক্ষে তিনি কী ধরনের প্রমাণ দিয়েছেন, তা প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়নি। স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ ছাড়া অভিযোগটিকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে বলা যায় না।
একইভাবে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির ‘হেডকোয়ার্টার পাকিস্তানে’—ওবায়দুল কাদেরের এই মন্তব্যেরও কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। তাই এটিকেও রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা প্রয়োজন।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গেও ওবায়দুল কাদের বলেন, তিনি দেশে ফিরবেন এবং দেশ ও জনগণের জন্য কাজ করবেন। শেখ হাসিনা এর আগে ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন। জুলাইয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে প্রথম আলো জানিয়েছিল, শেখ হাসিনা ডিসেম্বর মাসে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে তাঁর প্রত্যাবর্তনের নির্দিষ্ট তারিখ বা বাস্তবায়ন সম্পর্কে নিশ্চিত সরকারি ঘোষণা তখনও ছিল না।
শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরানোর বিষয়টিও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে আছে। ১০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠকে বাংলাদেশ শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দ্রুত করার প্রত্যাশা জানায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ভারতকে প্রয়োজনীয় নথিও দিয়েছে।
ওবায়দুল কাদের নিজের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন। তাঁর দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে ৪৫০টির বেশি মামলা হয়েছে। তিনি নিজের বিরুদ্ধে হত্যা ও হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং রাজনৈতিক জীবনে দুর্নীতি ও ঘুষের অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তবে তাঁর বিরুদ্ধে মামলার সঠিক সংখ্যা ও প্রতিটি মামলার বর্তমান আইনি অবস্থার বিস্তারিত তথ্য ছাড়া ‘৪৫০টির বেশি মামলা’ সংখ্যাটিকে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না। এ কারণে সংবাদে এটি তাঁর নিজের দাবি হিসেবেই রাখা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও সক্রিয় হওয়ার জন্য আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের আহ্বান জানান ওবায়দুল কাদের। তরুণদের দেশের কাজে যুক্ত করার এবং ভবিষ্যতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ গঠনের প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।
বর্তমান বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে ওবায়দুল কাদেরের মন্তব্যটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সাম্প্রতিক সরকারি তথ্যের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়—দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য ও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু থাকা সত্ত্বেও কূটনৈতিক যোগাযোগ বন্ধ হয়নি। বরং তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। ভারতীয় হাইকমিশনারও প্রকাশ্যে দুই দেশের মধ্যে গঠনমূলক যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
ফলে ‘ভারতের সঙ্গে বিএনপি যে পথে এগোচ্ছে, তা বাংলাদেশের জন্য আত্মঘাতী’ এটি ওবায়দুল কাদেরের রাজনৈতিক মূল্যায়ন; এটিকে স্বাধীনভাবে প্রমাণিত কোনো তথ্য বা দুই দেশের সম্পর্কের বিষয়ে সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। একইভাবে তাঁর বক্তব্যে থাকা ইউনূস, তারেক রহমান ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগগুলোকেও প্রমাণিত সত্য হিসেবে নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে প্রকাশ করাই নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে যথাযথ।