ঐতিহ্যবাহী আমেরিকাই কি ডেমোক্র্যাটদের অপছন্দ? ইনগ্রাহামের বিস্ফোরক অভিযোগ
গির্জা, পরিবার, পতাকা ও বড় গাড়িকে ঘিরে ইনগ্রাহামের মন্তব্যে ডেমোক্র্যাটদের মূল্যবোধ নিয়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আজ।
ঐতিহ্যবাহী আমেরিকাই কি ডেমোক্র্যাটদের অপছন্দ? ইনগ্রাহামের বিস্ফোরক অভিযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও তীব্র হয়েছে সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকেন্দ্রিক বিতর্ক। জনপ্রিয় রক্ষণশীল টেলিভিশন উপস্থাপক লরা ইনগ্রাহাম ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রভাবশালী অংশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন, তারা নাকি ঐতিহ্যবাহী আমেরিকান জীবনধারার প্রতি বিরূপ। তাঁর বক্তব্যে বড় পরিবার, রোববার গির্জায় যাওয়া, বড় গাড়ি ব্যবহার এবং জাতীয় পতাকা প্রদর্শনের মতো বিষয়কে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
ইনগ্রাহাম তাঁর অনুষ্ঠানে দাবি করেন, আমেরিকার প্রচলিত পারিবারিক ও দেশপ্রেমিক জীবনযাপনের কিছু দৃশ্য ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে ক্ষমতাবান কণ্ঠগুলোকে অস্বস্তিতে ফেলে। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল—বড় পরিবার নিয়ে গির্জায় যাওয়া, বড় গাড়িতে চলাফেরা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা ওড়ানোকে কিছু রাজনৈতিক মহল যেন নেতিবাচকভাবে দেখে। তবে এই বক্তব্যকে সরাসরি প্রমাণিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ইনগ্রাহাম সাম্প্রতিক মাসগুলোতে একই ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য একাধিকবার দিয়েছেন। জুলাইয়ের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী ঘিরে প্রচারিত একটি অনুষ্ঠানে তিনি বামপন্থী ও ডেমোক্র্যাটদের দেশপ্রেম এবং জাতীয় পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। একই সময় তিনি দাবি করেন, ডেমোক্র্যাটদের একটি অংশ ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক মূল্যবোধ ও পতাকাবাহী দেশপ্রেমের প্রতি বিরক্ত।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইনগ্রাহামের বক্তব্য মূলত রাজনৈতিক মতামত ও ব্যাখ্যা। এটি এমন কোনো গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত নয় যে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রভাবশালী নেতারা সামগ্রিকভাবে ঐতিহ্যবাহী আমেরিকান জীবনধারাকে ঘৃণা করেন। বরং বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে ধর্ম, দেশপ্রেম ও সামাজিক মূল্যবোধের বিষয়ে বড় ধরনের মতপার্থক্য থাকলেও দুই দলের ভেতরেই ব্যাপক বৈচিত্র্য রয়েছে।
পিউ গবেষণা কেন্দ্রের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, রিপাবলিকানদের তুলনায় ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ধর্মীয় অনুশীলন অপেক্ষাকৃত কম। ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের বড় পরিসরের জরিপ অনুযায়ী, রিপাবলিকান বা রিপাবলিকানঘেঁষা প্রাপ্তবয়স্কদের ৪১ শতাংশ মাসে অন্তত একবার ধর্মীয় উপাসনায় অংশ নেন, যেখানে ডেমোক্র্যাট বা ডেমোক্র্যাটঘেঁষাদের ক্ষেত্রে এই হার ২৪ শতাংশ। ধর্মকে জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করার ক্ষেত্রেও দুই দলের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে।
কিন্তু এই পরিসংখ্যান থেকে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না যে ডেমোক্র্যাটরা গির্জা, পরিবার বা আমেরিকান পতাকার বিরোধী। কারণ ডেমোক্র্যাটিক জোটের ভেতরে ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর বড় অংশ রয়েছে। বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ধর্মীয়তার মাত্রা শ্বেতাঙ্গ ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি বলে পিউয়ের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
২০২৬ সালের আরেকটি পিউ জরিপেও ধর্ম নিয়ে দুই দলের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা গেছে। জরিপে ৭৫ শতাংশ রিপাবলিকান বা রিপাবলিকানঘেঁষা মানুষ বলেছেন, আমেরিকান জীবনে ধর্মের প্রভাবকে তারা ইতিবাচকভাবে দেখেন। ডেমোক্র্যাট বা ডেমোক্র্যাটঘেঁষাদের মধ্যে এই হার ৩৮ শতাংশ। বিপরীতে ৩৭ শতাংশ ডেমোক্র্যাট ধর্মের সামাজিক প্রভাবকে নেতিবাচকভাবে দেখেছেন।
তবে একই জরিপে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। দুই দলের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই মনে করেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে প্রকাশ্যে সমর্থন করা উচিত নয়। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ৮৪ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের মধ্যে ৭৪ শতাংশ এমন মত দিয়েছেন। অর্থাৎ ধর্ম ও রাজনীতি নিয়ে দুই দলের মধ্যে বড় মতভেদ থাকলেও কিছু মৌলিক বিষয়ে উভয় পক্ষের মানুষের মধ্যে মিলও রয়েছে।
দেশপ্রেমের ক্ষেত্রেও বিভাজন রয়েছে। পিউয়ের ২০২৬ সালের বিশ্লেষণে দেখা যায়, আমেরিকানদের জাতীয় গর্বের উৎস নিয়ে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আবার পতাকা প্রদর্শন নিয়েও সাম্প্রতিক জরিপে দলীয় ব্যবধান দেখা গেছে। রয়টার্স ও ইপসোসের জরিপের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাধীনতা দিবসে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা প্রদর্শনের পরিকল্পনা রিপাবলিকানদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় অনেক বেশি ছিল।
তবে পতাকা না ওড়ানোকে সরাসরি দেশবিরোধিতা হিসেবে ব্যাখ্যা করাও সঠিক নয়। একই পতাকা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর কাছে ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে কারও কাছে এটি স্বাধীনতা ও আত্মত্যাগের প্রতীক, আবার কারও কাছে দেশের ইতিহাসের বৈষম্য ও বঞ্চনার স্মারক। ফলে একটি রাজনৈতিক দলের সব সদস্যকে একটি নির্দিষ্ট মনোভাবের মধ্যে ফেলে দেওয়া বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও ধর্মীয় মূল্যবোধ ও পরিবারকেন্দ্রিক ভাষা ব্যবহার করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেশ কয়েকজন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী খ্রিষ্টীয় ধর্মগ্রন্থ ও ধর্মীয় মূল্যবোধ ব্যবহার করে ধর্মবিশ্বাসী ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। এর মধ্যে ধর্মীয় নেতা ও ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়নকারী প্রার্থীরাও রয়েছেন।
এ থেকে বোঝা যায়, ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে কেবল ধর্মবিরোধী বা পরিবারবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা অতিরঞ্জিত হবে। দলটির ভোটার ও নেতাদের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষ, উদারপন্থী এবং প্রগতিশীল অংশ যেমন রয়েছে, তেমনি ধর্মবিশ্বাসী ও তুলনামূলক রক্ষণশীল অংশও রয়েছে।