তাইওয়ানকে মার্কিন অস্ত্র সহায়তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি উত্তর কোরিয়ার, বাড়ছে আঞ্চলিক উত্তেজনা

তাইওয়ানে মার্কিন যুদ্ধবিমান পৌঁছানোর পর চীনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সংঘাতের পরিণতি নিয়ে ভাবতে বলেছে উত্তর কোরিয়া।

তাইওয়ানকে মার্কিন অস্ত্র সহায়তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি উত্তর কোরিয়ার, বাড়ছে আঞ্চলিক উত্তেজনা

তাইওয়ানকে মার্কিন অস্ত্র সহায়তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি উত্তর কোরিয়ার, বাড়ছে আঞ্চলিক উত্তেজনা


উত্তর কোরিয়া তাইওয়ানকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা দেওয়ার তীব্র সমালোচনা করে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত নতুন এক মন্তব্যে বলা হয়েছে, তাইওয়ানকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ান প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে এবং চীনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করছে। সাম্প্রতিক সময়ে তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি নতুন যুদ্ধবিমান পৌঁছানোর পরই পিয়ংইয়ংয়ের এই বক্তব্য সামনে এসেছে। 

উত্তর কোরিয়ার সরকারি সংবাদ সংস্থায় প্রকাশিত মন্তব্যটি দেশটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক কিম মিয়ং-চোলের নামে প্রকাশ করা হয়। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের তাইওয়ান নীতিকে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনকে চীনের সঙ্গে তাইওয়ান ইস্যুতে মুখোমুখি সংঘাতের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে সতর্কভাবে চিন্তা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। 

উত্তর কোরিয়ার বক্তব্যের পেছনে সবচেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনা হলো তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি নতুন যুদ্ধবিমান পৌঁছানো। গত ২ অক্টোবর তাইওয়ানের পূর্বাঞ্চলীয় তাইতুং এলাকার একটি বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কেনা নতুন দুইটি এফ-১৬ভি যুদ্ধবিমান পৌঁছায়। এগুলো ২০১৯ সালে করা ৬৬টি যুদ্ধবিমানের একটি বড় ক্রয়ের প্রথম চালান। পুরো চুক্তির মূল্য প্রায় ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার। 

তাইওয়ানের জন্য এই যুদ্ধবিমান সরবরাহকে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। উন্নত রাডার, যোগাযোগব্যবস্থা ও অন্যান্য আধুনিক যুদ্ধপ্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা থাকায় নতুন যুদ্ধবিমানগুলো তাইওয়ানের বিদ্যমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে বলেছেন, নতুন যুদ্ধবিমান যুক্ত হওয়া দেশটির আত্মরক্ষার সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। 

তবে এই সামরিক সহায়তাকে চীন দীর্ঘদিন ধরেই কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে এবং বিদেশি শক্তির সঙ্গে তাইওয়ানের সামরিক সহযোগিতা ও অস্ত্র চুক্তির বিরোধিতা করে। অন্যদিকে তাইওয়ানের সরকার নিজেদের একটি গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত স্বশাসিত ভূখণ্ড হিসেবে পরিচালনা করে এবং নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর অধিকার রয়েছে বলে মনে করে। 

এই অবস্থানেই উত্তর কোরিয়া এবার প্রকাশ্যে চীনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। পিয়ংইয়ং বলেছে, তাইওয়ান প্রশ্ন চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং বাইরের কোনো শক্তির এতে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। উত্তর কোরিয়ার সাম্প্রতিক মন্তব্যে চীনের তথাকথিত এক চীন নীতির প্রতি সমর্থনও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। 

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, এই অবস্থান উত্তর কোরিয়া ও চীনের সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। চলতি বছরের জুনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং উত্তর কোরিয়া সফর করেন এবং কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকের পর দুই দেশ নিজেদের সম্পর্ককে আরও কৌশলগত পর্যায়ে উন্নীত করার কথা জানায়। ফলে তাইওয়ান ইস্যুতে পিয়ংইয়ংয়ের প্রকাশ্য সমর্থন বেইজিংয়ের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। 

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ানের মধ্যে সামরিক সহযোগিতার পেছনে দীর্ঘদিনের একটি নীতিগত কাঠামো রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাইওয়ানের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও মার্কিন আইনে তাইওয়ানের আত্মরক্ষার সক্ষমতা বজায় রাখতে প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র সরবরাহের সুযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধবিমান সরবরাহ সেই দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সহযোগিতারই অংশ। 

তাইওয়ানে নতুন যুদ্ধবিমান আসার ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন চীন ও তাইওয়ানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে। চীন নিয়মিত তাইওয়ানের আশপাশে সামরিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে বলে তাইপে অভিযোগ করে আসছে। একই সময়ে তাইওয়ান নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা এবং চীনের প্রতিক্রিয়া দুই দিক থেকেই তাইওয়ান প্রণালি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে রয়েছে। 

এদিকে উত্তর কোরিয়ার সাম্প্রতিক বক্তব্যের সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক দিনে পিয়ংইয়ং নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন জোরদার করেছে। ৩ অক্টোবর উত্তর কোরিয়া একটি মধ্যমপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার কথা নিশ্চিত করে এবং কিম জং উন নিজে ওই পরীক্ষার তদারকি করেন বলে দেশটির সংবাদমাধ্যম জানায়। এর ফলে কোরীয় উপদ্বীপে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি তাইওয়ান ইস্যুতেও উত্তর কোরিয়ার সক্রিয় মন্তব্য আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। 

তবে তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি যুদ্ধ শুরু করার ঘোষণা দেয়নি। বরং দেশটির বক্তব্যে চীনের সঙ্গে তাইওয়ান নিয়ে সংঘাতে জড়ালে যুক্তরাষ্ট্রকে সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। তাই সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত “উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধের চূড়ান্ত হুমকি দিয়েছে” এ ধরনের ভাষ্যকে অতিরঞ্জিত বলা হবে। যাচাই করা তথ্য অনুযায়ী, এটি মূলত রাজনৈতিক ও সামরিক সতর্কবার্তা। 

তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন যুদ্ধবিমান সরবরাহকে কেন্দ্র করে উত্তর কোরিয়ার প্রকাশ্য সতর্কবার্তা পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার নতুন মাত্রা তুলে ধরেছে। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ হিসেবে দাবি করছে, তাইওয়ান আত্মরক্ষার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা অব্যাহত রাখছে। এই তিন পক্ষের টানাপোড়েনের পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার চীনপন্থী অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলছে। আপাতত সরাসরি সামরিক সংঘাতের কোনো নতুন ঘোষণা নেই, কিন্তু তাইওয়ান প্রণালিকে ঘিরে শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা যে আরও তীব্র হচ্ছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর