পুতিনের জন্মদিনে কিমের অঙ্গীকার, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করবে উত্তর কোরিয়া

পুতিনের জন্মদিনে কিমের শুভেচ্ছা, রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত জোট আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকারে বাড়ছে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ।

পুতিনের জন্মদিনে কিমের অঙ্গীকার, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করবে উত্তর কোরিয়া

পুতিনের জন্মদিনে কিমের অঙ্গীকার, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করবে উত্তর কোরিয়া


উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব ও মৈত্রী আরও গভীর করার অঙ্গীকার করেছেন। উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপ জানিয়েছে, বুধবার ৭ অক্টোবর পুতিনের জন্মদিন উপলক্ষে পাঠানো এক চিঠিতে কিম দুই দেশের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে নিজের দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। 

তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, কিমের পক্ষ থেকে পুতিনকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা পাঠানোর খবরটি সত্য। শুধু শুভেচ্ছা জানানোতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি উত্তর কোরিয়ার নেতা; তিনি রাশিয়ার সঙ্গে গড়ে ওঠা সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্ব ও জোটকে আরও বিস্তৃত এবং শক্তিশালী করার কথা বলেছেন। উত্তর কোরিয়ার সরকারি সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, কিম বলেছেন দুই দেশের যৌথ কাজ ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন করা তাঁর সরকারের দৃঢ় নীতি এবং তাঁর নিজের অটল সিদ্ধান্ত। 

চিঠিতে কিম পুতিনকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে সম্বোধন করেন এবং দুই দেশের সম্পর্কের উন্নয়নে নতুন অধ্যায় উন্মোচনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। তিনি রাশিয়ার প্রতি নিজের অবিচল সমর্থনের কথাও জানান। একই সঙ্গে রাশিয়ার সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা স্বার্থ ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার লড়াইকে তিনি ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ হিসেবে উল্লেখ করে সেটিতে রাশিয়ার বিজয় হবে বলে আস্থা প্রকাশ করেন। 

কিমের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের সম্পর্ক গত কয়েক বছরে দ্রুত ঘনিষ্ঠ হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুনে পুতিনের উত্তর কোরিয়া সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্বের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই চুক্তিতে কোনো পক্ষ আক্রান্ত হলে অপর পক্ষ সহায়তা করার মতো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ধারা রয়েছে। এর ফলে দুই দেশের সম্পর্ক সাধারণ কূটনৈতিক সহযোগিতার সীমা ছাড়িয়ে নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতার পর্যায়ে পৌঁছেছে। 

এরপর থেকেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার সামরিক সহযোগিতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। দক্ষিণ কোরিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর বিভিন্ন মূল্যায়নে বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে গোলাবারুদ ও সামরিক সহায়তা দিয়েছে এবং রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধে সেনাসদস্যও পাঠিয়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে উত্তর কোরিয়ার প্রায় ১৪ হাজার থেকে ১৫ হাজার সেনা রাশিয়ায় পাঠানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। 

কৌশলগত সম্পর্কের এই ঘনিষ্ঠতার বিনিময়ে উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার কাছ থেকে অর্থনৈতিক সহায়তা, সামরিক প্রযুক্তি ও যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই সহযোগিতা উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র, উপগ্রহ, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা পিয়ংইয়ংকে আরও সক্ষম করে তুলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করে। 

সম্প্রতি উত্তর কোরিয়ার সামরিক তৎপরতাও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজর কেড়েছে। ৩ অক্টোবর উত্তর কোরিয়া একটি মধ্যমপাল্লার কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালানোর কথা জানায়। দেশটির সরকারি সংবাদমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, কিম জং উন নিজে ওই মহড়ার তদারকি করেন। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের বিষয়টি শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে। 

এদিকে রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠতা শুধু সামরিক সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ নেই। দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব নিয়মিতভাবে পরস্পরের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন প্রকাশ করছে। চলতি বছরের আগস্টেও কিম পুতিনকে পাঠানো এক বার্তায় দুই দেশের সম্পর্কের আরও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রত্যাশা জানিয়েছিলেন। সেপ্টেম্বরে উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পুতিনও কিমকে অভিনন্দন জানিয়ে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও সুসংহত করার প্রতিশ্রুতি দেন। 

পুতিনের এবারের জন্মদিনে কিমের বার্তাকে তাই শুধু আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। বরং এটি রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও সামরিক ঘনিষ্ঠতার আরেকটি প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ, উত্তর কোরিয়ার সামরিক কর্মসূচি এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে দুই দেশ একে অপরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হয়েছে।

তবে কিমের চিঠিতে ইউক্রেনের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। রাশিয়ার যুদ্ধকে তিনি নিজের ভাষায় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষার ন্যায়সঙ্গত লড়াই হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ফলে এটি উত্তর কোরিয়ার দীর্ঘদিনের রুশপন্থী অবস্থানেরই ধারাবাহিকতা বলে মনে করা হচ্ছে। রয়টার্সও জানিয়েছে, কিমের বার্তায় রাশিয়ার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হলেও ইউক্রেন যুদ্ধের নাম সরাসরি বলা হয়নি। 

পুতিনের জন্মদিনে কিম জং উনের বার্তা রাশিয়া-উত্তর কোরিয়া সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতার স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। ২০২৪ সালের প্রতিরক্ষা চুক্তির পর দুই দেশের সহযোগিতা যেভাবে সামরিক ও কৌশলগত পর্যায়ে বিস্তৃত হয়েছে, এবারের বার্তা সেই সম্পর্ককে আরও দীর্ঘমেয়াদি করার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রাশিয়ার সঙ্গে তার সহযোগিতা পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণও অব্যাহত রয়েছে। 

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর