নেতানিয়াহুর দাবি, টিকে থাকার তাগিদেই ইসরায়েলের কঠোর যুদ্ধনীতি ও সামরিক শক্তির প্রদর্শন

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ইতিহাস, প্রত্যাবর্তন ও আত্মরক্ষার যুক্তি তুলে ধরে দেশের কঠোর নীতিকে অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজন হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন তিনি সম্প্রতি।

নেতানিয়াহুর দাবি, টিকে থাকার তাগিদেই ইসরায়েলের কঠোর যুদ্ধনীতি ও সামরিক শক্তির প্রদর্শন

নেতানিয়াহুর দাবি, টিকে থাকার তাগিদেই ইসরায়েলের কঠোর যুদ্ধনীতি ও সামরিক শক্তির প্রদর্শন


ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি বক্তব্যে দাবি করা হয়েছে, ইহুদি জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ ইতিহাস, নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার আকাঙ্ক্ষা এবং নিজ ভূমিতে ফিরে আসার ধারণাই ইসরায়েলের কঠোর সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি। প্রচারিত বক্তব্যে নেতানিয়াহুর নামে বলা হয়েছে, প্রাচীন বহু জনগোষ্ঠী সময়ের প্রবাহে বিলীন হয়ে গেলেও ইসরায়েলি জনগণ ধারাবাহিকতা, প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন এবং প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে নেওয়ার মানসিকতা ধরে রেখেছে। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্যটির হুবহু ভাষা নির্ভরযোগ্য সরকারি নথি বা সাম্প্রতিক প্রধান সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে এটিকে নেতানিয়াহুর সরাসরি ও পূর্ণাঙ্গ উদ্ধৃতি হিসেবে প্রচার করার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। 

তবে বক্তব্যটির মূল ভাবনার সঙ্গে নেতানিয়াহুর অতীত ও সাম্প্রতিক বিভিন্ন বক্তব্যের যথেষ্ট মিল রয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইহুদি জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের ইতিহাস, নির্বাসন, নিপীড়ন, প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়কে ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও সামরিক নীতির সঙ্গে যুক্ত করে আসছেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গত ২৪ সেপ্টেম্বর দেওয়া ভাষণেও তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অস্তিত্বগত হুমকির কথা উল্লেখ করেন এবং ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংসের সিদ্ধান্তকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ওই সিদ্ধান্ত না নিলে ইসরায়েলের অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারত। 

নেতানিয়াহুর বক্তব্যে ইতিহাসের ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য। তিনি প্রায়ই প্রাচীন ইসরায়েলি ইতিহাস, ব্যাবিলন ও রোমান সাম্রাজ্যের সময়কার ঘটনাবলি, মধ্যযুগের নিপীড়ন এবং আধুনিক যুগের ইহুদিবিদ্বেষ ও গণহত্যার স্মৃতিকে বর্তমান নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে যুক্ত করেন। অতীতের একাধিক ভাষণে তিনি বলেছেন, বহু প্রাচীন সাম্রাজ্য ও শক্তিশালী রাষ্ট্র ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেলেও ইসরায়েলি জনগণ টিকে রয়েছে। একই ধরনের বক্তব্যে তিনি ইহুদি জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষার কথাও তুলে ধরেছেন। 

এর ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া উদ্ধৃতিটির বিষয়বস্তু পুরোপুরি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক চিন্তার বাইরে নয়। কিন্তু নির্দিষ্ট বাক্যগুলো তিনি ঠিক কখন, কোথায় এবং কোন অনুষ্ঠানে বলেছেন এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে “অধিকাংশ প্রাচীন জনগোষ্ঠী আর অস্তিত্বে নেই”, “ধারাবাহিকতার সুতো” কিংবা “দায়ূদের তরবারি হাতে নেওয়া” ধরনের পুরো বক্তব্যটি সাম্প্রতিক সরকারি ভাষণের যাচাইকৃত প্রতিলিপিতে একইভাবে পাওয়া যায়নি। তাই এটিকে নিশ্চিত উদ্ধৃতি না বলে নেতানিয়াহুর বিভিন্ন বক্তব্যের ভাবধারার সঙ্গে মিল থাকা একটি প্রচারিত উদ্ধৃতি হিসেবে বিবেচনা করাই অধিক নিরাপদ।

তবে “দায়ূদের তরবারি” প্রসঙ্গটি নেতানিয়াহুর বক্তব্যে নতুন নয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে সংসদে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি স্পষ্টভাবে ইসরায়েলের শান্তির আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি “দায়ূদের তরবারি” হাতে রাখার কথা বলেছিলেন। সেখানে তিনি ইসরায়েলের শত্রুদের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ধরে রাখাকে নিরাপত্তার প্রয়োজন হিসেবে উপস্থাপন করেন। অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত উদ্ধৃতির এই অংশটি নেতানিয়াহুর পরিচিত রাজনৈতিক ভাষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। 

সাম্প্রতিক সময়ে নেতানিয়াহুর নিরাপত্তাকেন্দ্রিক বক্তব্য আরও জোরালো হয়েছে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপকে আত্মরক্ষার সঙ্গে যুক্ত করেন। তার বক্তব্যের সময় বহু দেশের প্রতিনিধি সভাকক্ষ ত্যাগ করেন, যা ইসরায়েলি সরকারের সামরিক নীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভাজনের মাত্রাও প্রকাশ করে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ভাষণটি আসন্ন ইসরায়েলি নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে দেওয়া হয় এবং এতে নেতানিয়াহু ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন। 

এর পর ৫ অক্টোবর ইসরায়েলের একটি রাষ্ট্রীয় স্মরণ অনুষ্ঠানে নেতানিয়াহু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার সঙ্গে বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির যোগসূত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ওই হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। ফলে তার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্যে অতীতের নিরাপত্তা সংকট, বর্তমান যুদ্ধ এবং ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা নীতিকে একই ধারায় উপস্থাপনের প্রবণতা স্পষ্ট। 

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক অবস্থানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি সামরিক শক্তিকে কেবল যুদ্ধের উপায় হিসেবে নয়, ইসরায়েলি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার হাতিয়ার হিসেবেও উপস্থাপন করেন। ২০২৬ সালের এপ্রিলের এক সরকারি বৈঠকের বক্তব্যে তিনি ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতাকে অতীতের ইহুদি নিপীড়নের অভিজ্ঞতার বিপরীতে দাঁড় করান। তার বক্তব্যের সারকথা ছিল, অতীতে ইহুদিরা নিজেদের রক্ষা করতে পারেনি, কিন্তু বর্তমান ইসরায়েল নিজস্ব সামরিক শক্তির মাধ্যমে প্রতিরোধ করতে সক্ষম। 

তবে এই ধরনের বক্তব্যের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলাদা করে দেখা দরকার। কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিয়ে একজন নেতার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নিজেই ঐতিহাসিক বা নৈতিক সত্যের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, গাজা ও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছে, আবার ইসরায়েল সরকার নিজেদের পদক্ষেপকে আত্মরক্ষা ও নিরাপত্তার প্রয়োজন হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। তাই নেতানিয়াহুর বক্তব্যকে প্রতিবেদনে তার রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে উপস্থাপন করা জরুরি, নিরপেক্ষভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে নয়। 

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর